সফল সন্তানের ঘরে মায়ের পরিণতি কি এটাই ?
অসহায় মায়ের মৃত্যুতে কসমোপলিটন সমাজকে দায়ি করে সাংবাদিক মির্জা মোনালিসার বিশ্লেষেন
একটি বন্ধ ঘর। জানালা দিয়ে গলে পড়ছে শেষ বিকেলের মলিন আলো। কিন্তু সেই আলোয় কোনো স্নিগ্ধতা নেই, আছে কেবল এক নিথর স্তব্ধতা। রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট বাড়ির বদ্ধ কক্ষ থেকে যখন পুলিশ দরজা ভেঙে উদ্ধার করল ৭২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের দেহাবশেষ, তখন তা পুরো সমাজের সামনে এক অমোঘ ও নির্মম প্রশ্ন ছুড়ে দিল—সফল সন্তানদের ঘরে মায়েদের শেষ পরিণতি কি এটাই?

গত সাত-আট দিন ধরে ঘরের ভেতরেই পচছিল মায়ের শরীর। হাড় থেকে খসে পড়ছিল মাংসখণ্ড। অথচ, সেই একই ছাদের নিচে, অন্য একটি কক্ষে বাস করছিলেন তাঁরই নিজের গর্ভজাত কন্যা! আর অন্য দুই মেরুতে বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যায়তনের শিক্ষক এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দুই ছেলে।
আমরা একবিংশ শতাব্দীর কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন যুগে বাস করছি। আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী, পকেটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা; আমাদের সন্তানেরা চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, আন্তর্জাতিক সেমিনারে দাঁড়িয়ে মানবতার জয়গান গায়। কিন্তু এই তীব্র আলোর নিচেই যে কত বড় অন্ধকার জমা হয়ে আছে, মিরপুরের এই ঘটনাটি তা আমাদের চোখের সামনে এক বীভৎস নগ্নতায় মেলে ধরল। দেশ-বিদেশের আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার সেই চিরচেনা কর্কট রোগ যেন এবার আমাদের চেনা উঠোনে এসে মানবিকতার সবটুকু সীমা পার করে দিয়েছে।
এক ছাদের নিচের দূরতম অবজ্ঞা
পল্লবী থানা পুলিশ যখন ঘরের দরজা খোলে, তখন সেই কক্ষটিকে মানুষের বাসযোগ্য ঘর বলে চেনার কোনো উপায় ছিল না। গণমাধ্যমের ভাষায় তা “ঘর নয়, যেন এক ভাগাড়”। চারদিকে স্তূপীকৃত ময়লা-আবর্জনা, দীর্ঘদিন ধরে ঝাড়ু না দেওয়া মেঝের ধুলো—সব মিলিয়ে অবহেলা আর চরম অযত্নের এক অন্ধকার কূপ। যে মা একদিন সন্তানদের একটু ভালো রাখার জন্য নিজের পুরো জীবনটা বিলিয়ে দিয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর ভাগ্যে জুটেছিল এই ভাগাড়সদৃশ এক চিলতে ঘর।
সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে তখনই, যখন জানা যায় এই নিঃসঙ্গ মৃত্যুর সময় তাঁর মেয়ে একই ফ্ল্যাটের অন্য একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন। সাত থেকে আটটি দিন একটি মানুষ না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কিংবা তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মারা গেলেন, অথচ পাশের ঘরের মানুষটি তাঁর কোনো সাড়াশব্দ পেলেন না! কোনো এক রোববার যখন মায়ের ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলছিল না, তখন এক নার্সকে ডেকে আনা হয়। সেই নার্স ঘরের ভেতরে গিয়ে যখন এই পচাগলা বীভৎসতা আবিষ্কার করেন, তখন সন্তানদের টনক নড়ে।
এই দীর্ঘ আটটা দিন কি একবারও ওই ঘরের দরজায় টোকা দিতে ইচ্ছে করেনি কন্যার? এক টেবিলে বসে দুটো ভাত খাওয়া কিংবা “মা, কেমন আছো?”—এই সামান্য চারটি শব্দ উচ্চারণ করার মতো সময় বা মানসিকতা কি গিলে খেয়েছে আমাদের এই তথাকথিত ব্যস্ত আধুনিকতা? মায়েরা আমাদের প্রতিটি কান্নার আওয়াজ দেয়াল ভেদ করে শুনতে পান। মাঝরাতে আমাদের সামান্য ‘উঁহু’ শব্দে মায়ের ঘুম ভেঙে যায়। অথচ আমরা যখন বড় ও ‘সফল’ হই, তখন মায়ের ঘরের ভেতরের আট দিনের নীরবতা কিংবা তাঁর মৃত্যুর নিথর গোঙানিও দেয়াল ভেদ করে আমাদের কানে পৌঁছায় না!
সফলতার মুকুট নাকি মানবিকতার দেউলিয়াত্ব?
নূরজাহান বেগমের সন্তানদের পরিচয় যখন সামনে আসে, তখন এই সমাজের মেরুদণ্ডটা যেন মড়মড় করে ভেঙে পড়ে। তাঁর এক ছেলে দেশের সর্বোচ্চ প্রযুক্তিগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুয়েটের শিক্ষক; যিনি প্রতিদিন শত শত তরুণকে জ্ঞান দেন, দেশ গড়ার কারিগর তৈরি করেন। আরেক ছেলে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা; যাঁর একটি কলমের খোঁচায় হয়তো হাজারো মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। তাঁরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, উচ্চশিক্ষিত এবং ‘সফল’ নাগরিকের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
কিন্তু এই সফলতার পেছনে যে মায়ের ত্যাগ মিশে ছিল, সেই মায়ের শেষ পরিণতি কী হলো? তাঁরা আলাদা আলিশান বাসায় থাকেন, নিজেদের সুন্দর সাজানো সংসার সামলান, বড় বড় সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অথচ তাঁদের জন্মদাত্রী মা ঢাকা শহরেরই এক কোণে, এক অপরিচ্ছন্ন ভাগাড়ের মতো ঘরে ধুঁকে ধুঁকে মারা যান। এই শিক্ষাকে আমরা কী বলব? এই সাফল্যকে আমরা কোন দাঁড়িপাল্লায় মাপব? আমাদের কসমোপলিটান যুগ আমাদের শেখাচ্ছে কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, কীভাবে কর্পোরেট সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা যায়; কিন্তু তা আমাদের ভেতর থেকে উপড়ে ফেলছে সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ আর ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাবোধের মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলি। সফলতার এই মুকুট আসলে মানবিকতার চরম দেউলিয়াত্বের একেকটি স্মারক মাত্র।
মা কি সন্তানের অবসাদ ঝেড়ে ফেলার ডাস্টবিন?
আমাদের সমাজে মায়েদের এক অদ্ভুত ছাঁচে ফেলা হয়। ভাবা হয়, মায়েরা হলেন এক পরম সহনশীল সত্তা, যাঁদের নিজেদের কোনো মন খারাপ থাকতে নেই, ক্লান্তি থাকতে নেই। জীবনভর মায়েরা পরিবারের সবার ক্ষোভ, অবসাদ, চাহিদা আর ভালো-মন্দের ভার নিজের কাঁধে নেন। সন্তানরা বড় হয়ে নিজেরা যখন ক্লান্ত হয়, তখন মায়ের কাছে এসে মনের সব আবর্জনা ঢেলে দেয়। কিন্তু মায়ের যখন বয়স হয়, যখন তাঁর একটু যত্নের প্রয়োজন হয়, তখন তাঁকে ফেলে রাখা হয় ঘরের এক কোণে—যেন তিনি এক অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। টাকা-পয়সা আর আবেগীয় ব্ল্যাকমেইলের এক অদ্ভুত জালে মায়েদের আমরা বন্দী করে রাখি।
আজকের এই নির্মম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের প্রচলিত ‘পারিবারিক কাঠামোর’ মিথ্যে অহংকার ভেঙে ফেলার সময় এসেছে। আমরা মুখে বলি “বৃদ্ধাশ্রম চরম পাপ”, কিন্তু ঘরের ভেতর মা-বাবাকে একাকীত্বের নরকে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার চেয়ে তো ‘অবসর নিবাস’ বা ‘অবসর পল্লী’ অনেক বেশি জরুরি। এর চেয়ে অনেক ভালো হয়, যদি আমাদের মায়েরা ৫৫ বা ৬০ বছর বয়সে এসে সংসারের এই মায়াজাল আর বিষাক্ত একাকীত্ব থেকে মুক্তি পান। শরীর ও মনের জোর থাকতে থাকতেই তাঁরা যদি কোনো ‘সিনিয়র সিটিজেন ভিলেজে’ সমমনা মানুষদের সাথে থাকার স্বাধীনতা পান—যেখানে তাঁরা গাছ পরিচর্যা করবেন, হাসিখুশি থাকবেন, নিজেদের একটা স্বাধীন আকাশ পাবেন—তবে জীবনের শেষ অধ্যায়টি এমন অবমাননাকর মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। সন্তানরা সেখানে যাবে কোনো সামাজিক লোকদেখানো বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, শুধু ভালোবাসার টানে।
সামষ্টিক বিবেকের পচন
নূরজাহান বেগমের এই করুণ কাহিনি কেবল একটি একক পরিবারের গল্প নয়; এটি আসলে আমাদের পুরো সমাজের, পুরো রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। আমরা মুখে বলি “দেশ আমাদের মা”, কিন্তু সেই মায়ের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত কী আচরণ করছি? আমরা দেশ নামক মায়ের থেকে শুধু সুবিধাই নিতে চাই। দুর্নীতি, অনিয়ম আর নিজেদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ-অবসাদের সমস্ত আবর্জনা আমরা এই দেশের ওপর উগড়ে দিই। কিন্তু এই দেশটাকে একটু পরিষ্কার রাখা, তাকে একটু শান্তিতে রাখা, তার যত্ন নেওয়ার বেলায় আমরা প্রত্যেকেই চরম উদাসীন আর আত্মকেন্দ্রিক। দেশটা এক কোণে পড়ে থেকে ভাগাড় হয়ে গেলেও আমাদের কিছু আসে যায় না, যতক্ষণ না আমাদের নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ব্যাহত হচ্ছে। মায়ের লাশে পচন ধরার এই গল্প আসলে আমাদের সামষ্টিক বিবেকের পচনের গল্প।
এই পৃথিবীর অবহেলা, সন্তানদের চরম উদাসীনতা আর নোংরা ভাগাড়ের একাকীত্ব যেন কোনো মাকে আর নিতে না হয়, সে লক্ষ্যে এখন থেকেই নজর দেওয়া জরুরি। আজ যে সন্তান মায়ের জীবনকে অবহেলা করছে, আগামীতে সে নিজেও যে একই চক্রে পড়বে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? কারণ, আমাদের বর্তমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দুর্বলের অনুকূলে নয়, বরং তা সবলের সদম্ভ পদচারণার ক্ষেত্র।
কসমোপলিটান যুগের অন্ধ গতিশীলতার ভিড়ে আমরা যেন মানুষ হিসেবে পচে না যাই, আমাদের ঘরগুলো যেন একেকটি ভাগাড়ে পরিণত না হয়—সেটাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মায়েদের শুধু ‘মা’ নামের বৃত্তে বন্দী না রেখে, তাঁদের একজন মানুষ হিসেবে স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার দেওয়া হোক। তাঁদের শেষ বয়সটা যেন ভাগাড়ের জীবন না হয়। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানিতে সন্তানের বেতন থেকে একটা অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে কেটে রাখা হয় মা-বাবার (Senior Citizens) সামাজিক ও চিকিৎসা সুরক্ষার জন্য। রাষ্ট্রের এই আইনি হস্তক্ষেপে মা-বাবার শেষ জীবনটা অন্তত সুরক্ষিত হয়, সন্তান সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও।
আসলে আমরা দেশের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করি, মায়ের সঙ্গেও ঠিক তাই করি। দিনশেষে একটি প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র হতে পারল না এ দেশ, আর আমরাও পারলাম না প্রকৃত মানুষ হতে।
