জাতীয় জাদুঘরে ইতিহাস কি মুছে ফেলা হচ্ছে নতুন বিন্যাসের অজুহাতে ?
আজ আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্য— “ বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধে জাদুঘর “
’।
যখন জাদুঘরকে ধরা হচ্ছে সম্প্রীতি ও মেলবন্ধনের প্রতীক, ঠিক তখনই দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর’ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা ও বিতর্ক। সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরকে ঘিরে ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শনে আসা সাধারণ দর্শনার্থীদের একাংশের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের কর্নারে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলাদা গ্যালারি ও একক দৃশ্যমান উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু এত বড় একজন মহানায়ক, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কর্নারে তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ, ‘৬৬-এর ছয় দফা কিংবা ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের কোনো জোরালো উপস্থাপন চোখের আড়ালে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার একটি ছোট ছবি ছাড়া বড় কোনো কাজের প্রতিফলন নেই।
দর্শনার্থীদের মতে, স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস ধীরে ধীরে আড়াল করার একটা প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি: “নিদর্শন সরানো হয়েছে সুরক্ষার স্বার্থে, ধ্বংস করা হয়নি। তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধু কর্নার সরানো হলেও কোনো স্মারক বা নিদর্শন নষ্ট করা হয়নি। গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় জাদুঘরে হামলা বা ভাঙচুরের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই কারণে কিছু প্রতিকৃতি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সাময়িকভাবে নিরাপদে স্টোরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। জাদুঘরের কোনো স্মারক ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।
‘৫২, ‘৭১ এবং ‘২৪-এর ধারাবাহিকতা: নতুন পরিকল্পনার আভাস
জাতীয় জাদুঘরের বর্তমান মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইতিহাসকে একপক্ষীয় নয়, বরং ধারাবাহিক ও গবেষণাভিত্তিকভাবে উপস্থাপনের নতুন পরিকল্পনা হচ্ছে। তাঁর মতে, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল, তা যথাযথভাবেই রাখা হবে। তবে একই সঙ্গে ১৯৭১-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এবং ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও সমভাবে গুরুত্ব পাবে।
মহাপরিচালক জানান, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে ডিজিটাল ও আধুনিক উপায়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। এ জন্য ১৭ সদস্যের পরিচালনা বোর্ডের অধীনে গবেষক, তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন এই বিন্যাসে কেবল দেয়ালে ঝোলানো ছবি নয়, বরং ভিডিওভিত্তিক উপস্থাপনা, অডিও গাইড ও ডিজিটাল এক্সপেরিয়েন্স যুক্ত করা হবে, যাতে মানুষ ইতিহাসকে ‘অনুভব’ করতে পারে Lights।
জাদুঘর সূত্রে জানা গেছে, তাদের কাছে মোট ৯৩ হাজার ২৪কে-টি নিবন্ধিত নিদর্শন থাকলেও জায়গার অভাবে ৪৬টি গ্যালারিতে মাত্র ৪,১৭৮টি (মোট সংগ্রহের প্রায় ৫ শতাংশ) প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে। এই সংকট কাটাতে বর্তমান ভবন সংস্কারের পাশাপাশি একটি ১০ তলা নতুন অ্যানেক্স ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষার্থে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যেই ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের জোর প্রস্তুতি চলছে। জাতীয় জাদুঘরের ভেতরেও একটি বিশেষ ‘জুলাই কর্নার’ স্থাপন করা হবে।
ইতিহাস কোনো স্থবির বিষয় নয়, সময়ের প্রয়োজনে তার বিন্যাস বদলাতে পারে। তবে সাধারণ মানুষ এবং ইতিহাসবিদদের প্রত্যাশা—রাজনৈতিক পটপরিবর্তন যেন কোনোভাবেই ইতিহাসের সত্য ও প্রধান চরিত্রগুলোকে মুছে না ফেলে, বরং প্রতিটি অধ্যায়ের বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ উপস্থাপনই হোক জাতীয় জাদুঘরের মূল লক্ষ্য।
