স্কুলগুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় লটারি পদ্ধতি বাদ যাচ্ছে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে। এর মানে, স্কুলে ভর্তির জন্য আবারও পরীক্ষায় বসতে হবে ছোট্ট সোনামণিদের ৷কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা বা লটারির বাইরে কি কোন বিকল্প নেই? আসলে বিকল্প ভাবা হচ্ছে না।

অনেক অভিভাবকই মনে করছেন, লটারির কারণে তাদের বাচ্চারা ভালো ছাত্র হওয়া স্বত্বেও ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
বাংলাদেশে ক্লাস ওয়ানে এর বাচ্চাদের বয়স সীমা ধরা হয়েছে ৬ বছরের ঊর্ধ্বে। এই বয়সের একটি বাচ্চা বর্ণ চিনবে, গুণতে শিখবে , দু’একটা ছড়া/রাইমস বলতে পারবে আর টুকটাক শব্দ বানান করতে পারবে। এমন যোগ্যতা বিচার করেই গত কয়েক বছর ধরে লটারি করে বাচ্চা ভর্তি নিচ্ছে স্কুলগুলো। বাকিটা তাদের ক্লাসে শেখানো হচ্ছে।

এসব বাচ্চাদের কেউ কেউ কিন্ডারগার্টেন স্কুলে দু’এক বছর পড়ে, তারপর বড় স্কুলগুলোতে পড়তে আসে। এদের অনেকেই রিডিং পড়তে শেখে না। তাই ওদের যখন আপনি পরীক্ষার হলে বসিয়ে দেবেন, এরা প্রশ্ন বুঝবে কি করে? নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে একা একা পরীক্ষা দিতে যেয়ে তাদের মনে যে পরীক্ষা ভীতি ঢুকে যাবে তার দায় কে নেবে?
মানলাম সব বাচ্চা একই মেধার নয়। বা সবাই ভয় পেয়ে প্রশ্ন গুলিয়ে ফেলবে তাও নয়। কেউ কেউ এই ছোট্ট বয়সেই বেশ পরিপক্ক হয়ে যায়। কিন্তু হাতে গোণা বয়সের তুলনায় এগিয়ে থাকা এইসব শিশুদের জন্য বাকিসব শিশুদের আমরা কেন এমন পরিস্থিতিতে ফেলবো, তা আমার বোধগম্য নয়।
সরকার চাইলে এসব শিশুদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলে আলাদা ব্যবস্থা নিক। দেশের স্বনামধন্য স্কুলগুলোতে দুই রকম ভর্তি প্রক্রিয়া থাকুক। ৫০ শতাংশ ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পাক। আর বাকি অর্ধেক, যারা তাদের বাচ্চাদের এই ইঁদুর দৌড়ে অংশ নেয়াতে চান না তারা লটারি দিয়েই চান্স পাক।
আদৌতে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হলে দেশে কোচিং বাণিজ্য আরো বেড়ে যাবে। কোমলমতি বাচ্চাদের ওপর অভিভাবকদের পড়াশোনার চাপ সৃষ্টি হবে। আর চান্স না পেলে হতাশ অভিভাবকের দ্বারা সেই বাচ্চার জীবনকে অতিষ্ট করে তোলার ঘটনাও নিকট অতীতে রয়েছে।
শুধু তাই নয়, দেখা যাবে যে, ভালো স্কুলে পড়ানোর লোভে অনেক অসাধু অভিভাবক তখন তার ৯ বছরের বাচ্চার বয়স কমিয়ে,তাকে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি পরীক্ষা দেয়াচ্ছে। সেক্ষেত্রে সেই বাচ্চা যখন চান্স পাবে তখন, ক্লাসে একটা নয় বছরের বাচ্চার মেধার সাথে একটা সাড়ে ৬ বছরের বাচ্চার মেধার পার্থক্য তুমুলভাবে দেখা যাবে। এতে করে তুলনামূলক কম মেধাবী বাচ্চাটার কনফিডেন্সও কমে যাবে। স্কুল ভীতি তৈরি হবে। মেধাবী ও অমেধাবীদের এই ভেদাভেদ সমাজে বৈষম্য তৈরির উদাহরণও সৃষ্টি করবে।
ভর্তি পরীক্ষা শুরু হলে শধু কোচিং না, ভর্তি গাইড ব্যবসাও শুরু হবে পুরোদমে। সরকার যখন দেশের গাইড বই আর কোচিং ব্যবস্থা ওঠিয়ে দিতে যাচ্ছে , তখন নতুন করে ছোট বাচ্চাদের ভর্তি পরীক্ষা সেই সিস্টেমকেই আবার ফিরিয়ে আনবে।
অন্যদিকে, বাছাই করা ভালো ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে স্কুলগুলো কৃতিত্ব অর্জন করবে। সাধারণ ছাত্র থেকে ভালো ছাত্র তৈরির চেষ্টাই কেউই করবে না।
দুনিয়া জুড়ে যখন শিক্ষা ব্যবস্থা সহজ ও শিশুবান্ধব হচ্ছে তখন আমরাই কেবল পেছনে ফিরে যাচ্ছি। বাইরের দেশে সব এলাকার মধ্যেই ভালো স্কুল আছে এবং যার যার এরিয়ার স্কুলে ভর্তি করা বাধ্যতামূলক, যার জন্য এডুকেশন সিস্টেম ও ঠিক থাকে। পৃথিবীর কোন দেশেই বাচ্চাদের কোনো ভর্তি যুদ্ধে অংশ নিতে হয় না। তাই তারা স্কুলে যেতে ভয় পায় না। হাইস্কুলে যেয়ে তারা নিজেদের মেধা অনুযায়ী স্কুল বাছাই করতে পারে ।
অথচ আমাদের দেশে বাচ্চার ৫ বছর হওয়ার আগেই তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয় স্কুল মানে একটি যুদ্ধ ক্ষেত্র এখানে ফাইট করে তোমাকে টিকে থাকতে হবে।তোমাকে অনেক অনেক পড়াশোনা করতে হবে।
এমনিতেই এদেশের বেশিরভাগ স্কুলে ঠিক মতো ক্লাস হয় না। স্কুল ছুটির পর বাচ্চাদের ছুটতে হয় কোচিং ক্লাসে। সেই সমস্যার সমাধানে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। শিক্ষার্থী নয় বরং সব স্কুল সমমানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে। সব স্কুলে ভালো শিক্ষক এবং ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
স্কুল এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা কোচিং না করিয়ে শ্রেনীকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিক। মেধা বিচার না করে সব বাচ্চাকে তারা ভর্তি করুক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার পাশাপাশি তাদের সম্মানজনক বেতন ভাতা প্রদান করুক। এতে করে শিক্ষার মান বাড়বে।লটারি সিস্টেমর সুফলও পাওয়া যাবে।
তাই সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে , দয়া করে নিজেদের মনগড়া কোন শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না। বাচ্চাদের মানসিক চাপের কারণ হয়ে তাদের সুন্দর শৈশব নস্ট করবেন না। প্রয়োজনে শিক্ষাবিদদের সাথে পরামর্শ করে বিকল্প কোন ব্যবস্থা নিন। তারপরও ভর্তি পরীক্ষার নামে অমানবিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন।
নাজিয়া শাকুর
