৫ আগস্ট ২০২৪। বাংলাদেশের রাজনীতির মহাকাব্যিক পটপরিবর্তনের সেই দিন। সংসদ ভবনের দেয়াল টপকে যখন উত্তেজিত জনতা ভেতরে ঢুকছে, তখন রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কোথায় ছিলেন? সেই উত্তাল মুহূর্ত থেকে ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিলের গভীর রাত পর্যন্ত—দীর্ঘ ১৮ মাস তিনি ছিলেন এক ‘অদৃশ্য ছায়া’। ধানমণ্ডির বিলাসবহুল ড্রয়িংরুম থেকে যখন ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করল, তখন দেশবাসীর মনে একরাশ প্রশ্ন: কোথায় ছিলেন তিনি এতদিন? কেন তাকে রিমান্ডে নেওয়া হলো না? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আদালত প্রাঙ্গণে একজন সাবেক স্পিকারের সঙ্গে যে অভব্য আচরণ করা হলো, সেই নৈতিক দেউলিয়াপনার দায় কে নেবে?

৫ আগস্টের সেই রুদ্ধশ্বাস ৮ ঘণ্টা শিরীন শারমিন চৌধুরী কাটিয়েছিলেন সংসদ ভবনের একটি শৌচাগারহীন ছোট কক্ষে। বাইরের উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচতে সামনে ভাঙা আসবাবপত্র দিয়ে আড়াল তৈরি করা হয়েছিল। গভীর রাতে সেনাবাহিনীর বিশেষ উদ্ধারকারী দল তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এর পরের ১৮ মাস ছিল এক চরম প্রশাসনিক প্রহসন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন তাকে ‘খুঁজে পাচ্ছে না’ বলে দাবি করছিল, তখন তিনি শান্ত মাথায় অনলাইনে পাসপোর্ট নবায়নের ফর্ম পূরণ করছিলেন। ডিজিটাল যুগে একজন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করা অসম্ভব নয়, যদি না রাষ্ট্র স্বয়ং তাকে খুঁজে না পাওয়ার অভিনয় করে।
শোনা যাচ্ছে, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একা ছিলেন না। সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী দুইজন সাবেক উপদেষ্টার সঙ্গে তার ছিল সার্বক্ষণিক যোগাযোগ। গুঞ্জন রয়েছে, এই দুজনের মধ্যে একজন ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর এক নারী উপদেষ্টা। প্রশ্ন জাগে, এই দীর্ঘ ১৮ মাস কি তবে তিনি কোনো বিশেষ ‘সেফ প্যাসেজে’ ছিলেন? প্রশাসনের একটি অংশ কি তাকে ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছিল? নাকি এটি ছিল কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অংশ? একজন ফেরারি আসামি যখন রাষ্ট্রীয় নজরদারি এড়িয়ে ১৮ মাস দিব্যি জীবন কাটিয়ে দেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আমাদের শাসনতন্ত্রে এখনো ‘পর্দার আড়ালের’ খেলা বন্ধ হয়নি।
শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল তার রিমান্ড নামঞ্জুর হওয়া। জুলাই আন্দোলনের সময় লালবাগ থানায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তাকে প্রধান অভিযুক্ত করা হলেও আদালত তাকে রিমান্ডে পাঠাতে সম্মত হননি। যেখানে আওয়ামী লীগের অন্যান্য হেভিওয়েট নেতাদের ক্ষেত্রে আদালত অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, সেখানে স্পিকারের বেলায় এই নমনীয়তা কেন?
আইনি বিশ্লেষকরা বলছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর ভিত্তি ছিল নড়বড়ে। আশরাফুল নামের যে ছেলেটি মামলা করেছে, সে ১৭ জুলাইয়ের ঘটনায় শিরীন শারমিনকে সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। কিন্তু স্পিকারের মতো একটি সাংবিধানিক পদের ব্যক্তি কীভাবে মাঠ পর্যায়ের একটি ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারেন, তা নিয়ে আদালতের মনেও হয়তো সন্দেহ ছিল। এছাড়া তার বয়স, সামাজিক অবস্থান এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কোনো সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকার বিষয়টি বিচারকের বিবেচনায় আসতে পারে। তবে জনমনে প্রশ্ন রয়েই যায়—এটি কি কেবলই আইনি সিদ্ধান্ত, নাকি নেপথ্যের সেই ‘উপদেষ্টা’ মহলের কোনো মধ্যস্থতার ফল?
একজন সাবেক স্পিকারকে যখন আদালতে তোলা হলো, তখন আমরা যা দেখলাম তা কোনো সভ্য দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। আদালত প্রাঙ্গণে তাকে ঘিরে যে ধরনের ধস্তাধস্তি, অশালীন চিৎকার এবং শারীরিক হেনস্তা করা হয়েছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির অবমাননা নয়, বরং বিচারব্যবস্থার পবিত্রতা নষ্ট করার নামান্তর। শিরীন শারমিন চৌধুরী দোষী না নির্দোষ, তা আদালত ঠিক করবে। কিন্তু একজন নারীকে যেভাবে সাধারণ অপরাধীর মতো টানা-হেঁচড়া করা হলো, তার দায় কার?
নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী বা হাসনাত আবদুল্লাহদের মতো তরুণ নেতারা যেভাবে সিনিয়র রাজনীতিবিদদের অপমান অপদস্ত করছেন, তা কি আগামী দিনের জন্য সুস্থ কোনো পথ তৈরি করছে? শিরীন শারমিন চৌধুরীর পুরো রাজনৈতিক জীবনে কেউ একটি অশোভন কথা দেখাতে পারবে না। অথচ তাকে যেভাবে আদালতের বারান্দায় লাঞ্ছিত হতে হলো, তা দেখে মনে হয় আমরা একটি ‘মব জাস্টিস’ বা গণ-আদালতের যুগে প্রবেশ করেছি। আসিফ নজরুলদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই সংস্কৃতি আজ বিএনপি-জামায়াতকেও গ্রাস করছে। ১৭ বছরের শাসনে আওয়ামী লীগ অনেক জুলুম করেছে ঠিকই, কিন্তু আদালত প্রাঙ্গণে বড় নেতাদের এভাবে কিল-ঘুষি মারার ঘটনা কি নিয়মিত ছিল? কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যখন হয়েছে, তখনও তাদের ওপর এভাবে শারীরিক আঘাতের সংবাদ আসেনি। তবে আজ কেন এই অধঃপতন?
আজ যারা শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো একজন মার্জিত মানুষকে হেনস্তা করছে, তারা আসলে রাজনীতিবিদদের জন্যই রাজনীতিকে কঠিন করে তুলছে। শাহরিয়ার কবীরকে আশি বছর বয়সে জেলে থাকতে হচ্ছে, কারণ তিনি সারা জীবন রাজাকারদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। অন্যদিকে মামুনুল হকের মতো ব্যক্তিরা ‘সাফল্যের’ হাসি দিয়ে জেল থেকে বের হচ্ছেন। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসরা এখনো কারাগারে ধুঁকছেন। এই যে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা দেশকে কোন অন্ধকার গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে?
