আত্মমর্যাদা নিয়েই কবরে শায়িত ব্যাতিক্রমী রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ
বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্থ সহচর , উনসত্তরের গনঅভূত্থানের মহানায়ক , আওয়ামী লীগের তোফায়েল, নয়বারের এমপির জানাজা হলোনা সংসদ ভবনে !
“এখন বিদায়ের পালা। এক জায়গায় তো শেষ করতে হবে। এবং সে বিদায়টা আমি নিতে চাই সম্মানের সাথে; যাতে আত্মমর্যাদা নিয়ে, কবরে যাওয়া যায়। আমাদের চ্যাপ্টার… আমার চ্যাপ্টার ক্লোজড। এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা।”- এই বক্তব্য তোফায়েল আহমেদের , টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বরেছিলেন পরিনত বয়সে । শেষ বিদায়ের আগেই নীরব হয়ে গিয়েছিলেন কিংবদন্তীতুল্য এই রাজনীতিক । উনসত্তরের গনঅভূত্থানের মহানায়কের অভিধা তার প্রাপ্য হয়েছিল, ছাত্ররাজনীতিতে তারকা হয়ে ওঠার কারনে।

আর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে,মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন মুজিববাহিনীর অন্যতম সংগঠন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পেলেও কারা অন্ধকারে কাটানো পাঁচবছর শেষে ফিরেছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেই।

সাংগঠনিক সম্পাদক,প্রেসিডিয়াম সদস্য আর শেষে উপদেষ্টা হলেও ,যিনি নিজের পরিচয় দিতেন “ আওয়ামী লীগের তোফায়েল “ হিসেবে। নয় নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ভোলারে একাধিক আসন থেকে। কিন্তু আজ তার জানাজা হয়নি জাতীয় সংসদ ভবনে,যে জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও ভোলার মানুষ।

ক্ষমতা নয়, আত্মমর্যাদাকেই জীবনের শেষভাগে সবচেয়ে বড় করে দেখেছিলেন কিংবদন্তিতুল্য এই ব্যতিক্রমি রাজনীতিবিদ। যিনি প্রায় সাড়ে ছয় দশক ধরে জড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আর স্বাধীন দেশের সকল গনতান্ত্রিক আন্দোলনে। দেশের রাজনীতি ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ছিল শক্ত অবস্থান । বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরশ্রীকাতরতা আর সংকীর্ণতা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল প্রবীন বয়সে। তিনি ফিরে যেতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় নেতার কাছে। যাকে নিজে ১৯৬৯ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারিত্তে রেসকোর্সের জনসমুদ্রে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু উপাধি। তাই তোফায়েল আহমেদকে বলা হতো শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্থ সহচর।

“আমি ওপরের থেকে যখন নিচে নামি, প্রথমেই বঙ্গবন্ধুকে দেখি। আজ সেই বঙ্গবন্ধুর কাছে ফিরে যাই—এত মহান নেতা, এত বড় মন! আজকে তো আমরা একজনকে আঘাত করে, আহত করে আনন্দ পাই, খুশি হই। বঙ্গবন্ধু তার শত্রুকেও আঘাত করতে জানতেন না। আজকে সেই কালচার হারিয়ে গেছে।” আওয়ামী লীগে কিছুটা কোনঠাসা হয়েছিলেন যখন তিনি অভিজ্ঞতায় ভরপুর । ২০০৯ সালে সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দল দ্বিতিয়বার ক্ষমতায়ে এসে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকলে একবারই শুধু মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তুখোর বক্তা আর দেশের রাজনীতির প্রতিটি বাকবদলের দিন তারিখ মুখস্ত রাখা এই ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ ।

মুখের সামনে না করে দেয়া বা কখনও সামনাসামনি কড়ামেজাজ দেখালেন নরম মনের মাতৃভক্ত মানুষটিই ছিলেন এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। বরিশালের বিএম কলেজ থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংসদ থেকে ডাকসু ভিপি হয়ে তিনি নিজের সাংগঠনিক দক্ষতায় হয়ে উঠেন ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক।

১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিববাহিনীর অন্যতম সংগঠক্ও ছিলেন তিনি।১৯৭৫-এর কালো অধ্যায়ের পর প্রায় ৫ বছর কাটিয়েছেন অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে। কিন্তু সামরিক স্বৈরাশাসন আর ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ কখনো থামেনি। রাজপথে তিনি ছিলেন আপসহীন, নির্ভীক।আর সংসদে যুক্তিতর্কের প্রথম সারির একজন পার্লামেন্টিরিয়ান। তাই নয়বারের সংসদ সদস্যের বরনমালা তার গলায় স্থায়ী হয়েছিল।

রাজনীতির মাঠ পেরিয়ে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তাঁর নিজের জেলা ভোলার পরম আশ্রয়, উন্নয়নের অনন্য রূপকার। ভোলার বাংলাবাজারে তিনি গড়ে তুলেছেন মেডিকেল কলেজ, মায়ের নামে বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা আর স্বাধীনতা জাদুঘরের মতো বহু জনকল্যাণমূলক জনপ্রতিষ্ঠান।তবে ভোলার মানুষের জন্য একটি সেতু, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আর স্টেডিয়াম নির্মাণের শেষ ইচ্ছাগুলো তাঁর অপূর্ণই রয়ে গেছে।

কিন্তু এই মহান নেতার শেষ বিদায়ের আয়োজনও এড়াতে পারেনি রাজনীতির সংকীর্ণতা। সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে কোনোমতে মুখ রক্ষা হলেও, সংসদ ভবনে তাঁর জানাজা না হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয় তীব্র ক্ষোভ।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় সংসদের স্পিকারের উচিত ছিল সংসদ ভবনে এই বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ানের জানাজার ব্যবস্থা করা। কারণ, অতীত ইতিহাস বলে—আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা সাদেক হোসেন খোকার জানাজা সংসদ ভবনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।স্পিকারের কাছে অনুরোধও জানানো হয়েছিল। ভোলার সন্তান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন রাজনৈতিক উদারতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন ।

রাজনীতির এই বিভেদ প্রকাশ পায় দলীয় শোকবার্তাতেও। প্রধানমন্ত্রীর শোকবাণীর পাশাপাশি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ করত, তবে তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকত। উল্টো ভোলায় স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী শো-ডাউন করে জানাজায় বাধা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন জনমানুষের তোফায়েলভক্তির রুদ্ররোষে পড়ে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধ তোফায়েল আহমেদকে গার্ড-অব-অনার দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ।

অনুগামীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘এককথার মানুষ’। রাজনীতিতে কখনো চাতুরী বা প্রতারণার আশ্রয় নেননি। দলমতের ভিন্নতা থাকলেও সবাইকে স্নেহ আর সমাদরে আগলে রেখেছেন আজীবন। তাই একজন সাবে সচিব মন্তব্য করেছেন যে রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে গেলে তোফায়েল আহমেদ চেষ্টা করতেন তাকে সেই বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে । দোষেগুনের উপরে নন কোনো মানুষই,তারপর ধানমন্ডির জানাজায় মসজিদ প্রাঙ্গণে “জয় বাংলা” স্লোগানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মীরা শেষ বিদায় জানায় তাদের প্রিয় রাজনৈতিক অভিভাবককে। তেমন একজন রাজনীতিক যখন মুমুর্ষ অবস্থায় মৃত্যুর ক্ষণ গুনছেন হাসপাতালের শয্যায়,তখন তার বিরুদ্ধে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া নিয়ে সমালোচনা হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে ।

তবে রাজনীতির টেবিল যাই বলুক, সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ছিল সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। রাতের আঁধারে বা সকালে বিরোধী পক্ষ থেকে জানাজার প্রচ্ছন্ন বিরোধিতা বা অনীহা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে ভোলার গ্রামের বাড়িতে তোফায়েল আহমেদের জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল তাকে তার শেষ সম্মান দিয়েছেন। সব বাধা আর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চুরমার করে প্রিয় নেতাকে শেষ দেখা দেখতে ছুটে আসে সাধারণ মানুষ।

ক্ষমতার মোহ পেছনে ফেলে, আত্মমর্যাদার চাদর মুড়ি দিয়ে ওপারে চলে গেছেন তোফায়েল আহমেদ। বুকে জাতীয় পতাকা ধারন করে তার শেষ গন্তব্য ১৫ আগস্টে নিহত বঙ্গবন্ধুর কাছেই । আর সেখানে আছেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী আমেনা আহমেদ, যিনি প্রয়াত হয়েছেন অল্প কিছুদিন আগে, অসুস্থায় নীরব তোফায়েল আহমেদ বুঝতে পারেননি সেই শোকও।
