বাচ্চা দেখার জন্য এখন আমার চাকরি ছাড়তে হবে?
বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে বিশেষ মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন মীর্জা মোনালিসা
কী করবো? এতদূর এসে চাকরি ছেড়ে দেবো? তাহলে পড়াশোনা করলাম কেন? এতো যে যুদ্ধ করলাম, পুরুষের সঙ্গে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম, চাকরি নিলাম, সংসারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনলাম, এর কোনো মানে রইল না? বাচ্চা দেখার জন্য এখন আমার চাকরি ছাড়তে হবে?

স্বামী বোঝালেন, “ধরো রুমি, তুমি যদি এখন চাকরি করো, তাহলে একজন ফুলটাইম হেলপিং হ্যান্ড রাখতে হবে, যার বেতন ১০ হাজার টাকা। তার ওপর খাওয়া-কাপড়, আলাদা শোবার ঘর, তার বিনোদনের ব্যবস্থা করা—কত টাকার ঝক্কি! তার ওপর সে তোমার বাচ্চাকে ঠিকমতো পালবে কি না সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।”
“তাই বলে আমার চাকরি ছাড়তে হবে? আর কদিন পরই প্রমোশন হবে, আমি পলিসি লেভেলে যাবো। তুমি তো একটু স্যাক্রিফাইস করতে পারো। তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। আমি বাচ্চা ধারণ করেছি, শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, এখন বাকিটা তুমি করো। আমি ক্যারিয়ারের শিখরটা দেখি!”
“কী বলছো তুমি? আমি চাকরি ছাড়বো মানে? বউয়ের কামাই খাবো? ঘরজামাই হবো?”
“না কেন? বাচ্চা তো আমরা দুজনেই এনেছি। আমাদের দুজনেরই দায়িত্ব না বাচ্চা পালা?”
প্রিয় পাঠক, এটা একটি বাস্তবতাঘেঁষা কাল্পনিক গল্প। সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশের পরিবার ও সন্তানের জন্য নারীদেরই চাকরি ছাড়তে হয়। আরও অনেক কারণে ছাড়তে হয়—অফিসের কর্মপরিবেশ, বেতন কম, পরিশ্রম বেশি, জেন্ডার ফ্রেন্ডলি কর্মক্ষেত্রের অভাব। অনেক অফিসে পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা না থাকার কারণেও নারীরা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।
যাই হোক মূল আলোচনায় থাকি; ৭৬ শতাংশ নারী চাকরি ছাড়েন সন্তান ও পরিবারের জন্য। ব্র্যাকের একটি সমীক্ষা সম্প্রতি এই তথ্যই জানিয়েছে।
গার্মেন্টস সেক্টরে যে নারীরা অর্থনীতির চাকা ঘোরাচ্ছেন, তারা গ্রামে মা বা শাশুড়ির কাছে সন্তান রেখে রাজধানীতে চাকরি করছেন। এমনকি উত্তরার দিকে গার্মেন্টস কর্মীদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার আছে। মা কাজে চলে যান, বাবা অটোরিকশা চালাতে বের হওয়ার আগে বাচ্চাকে সেখানে দিয়ে আসেন। আবার মা ফেরার পথে সন্তানকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এটা অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। এ ঘটনা জেনেছিলাম আমাকে অফিসে পৌঁছে দেওয়ার সময় অটোরিকশা চালক সারোয়ার হোসেনের কাছ থেকে।
আর মধ্যবিত্ত নারী?
ব্র্যাকের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ শতাংশ পেশাজীবী নারী পারিবারিক দায়িত্ব ও মাতৃত্বের কারণে ক্যারিয়ারে দীর্ঘ বিরতি নিতে বাধ্য হন বা চাকরি ছেড়ে দেন। এর মধ্যে ৩৮.৮% নারী সরাসরি পারিবারিক দায়িত্ব এবং ৩৬% নারী সন্তান লালন-পালনকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্যক্তিগত পরিচয় তৈরি বা আর্থিক স্বাধীনতার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও, এই নারীরা এক ধরনের ‘প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক চক্রে’ আটকা পড়েছেন।
তাহলে কী দাঁড়ালো? কেন তারা এই চক্রে আটকে পড়েছেন? লুকানো বিষয়গুলো সামনে আনি।
প্রথমত, একক পরিবার। যৌথ পরিবারের অনেক দোষ আছে, কিন্তু পরিবারে অনেক মানুষ থাকার কারণে অন্তত শিশুটি নিরাপদ থাকতো, না খেয়ে থাকতো না। কেউ না কেউ তাকে দেখে রাখতো। একক পরিবার হওয়ায় শ্বশুর-শাশুড়িও এখন আর পুত্র-কন্যাদের সংসারে নাক গলাতে চান না। তবে অনেক মা-বাবা নাতি-নাতনিদের লালন-পালন করেন, কিন্তু সেই সংখ্যাটা কম। তাতে করে কর্মজীবী নারীদের খুব যে উপকার হয় তাও না। বাড়ি ফিরেই শাশুড়ির সঙ্গে খিটিমিটি আর অভিযোগ—‘সারাদিন তোমার বাচ্চা দেখেছি, এখন তুমি দেখো।’ সেই নারীটির ফ্রেশ হওয়ারও সময় থাকে না। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না সে কি ক্লান্ত? এক কাপ চা খাবে?
এগুলো আসলে নারীদের জন্য ইউটোপীয় ভাবনা যে কেউ তাকে বুঝবে। আসলে বোঝার দায়িত্ব কার, জানেন?
রাষ্ট্রের। একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোই কেবল নারীদের এই ঝরে পড়া ঠেকাতে পারে।
স্কুলিং বনাম অফিস টাইম:
আমাদের স্কুলিং সিস্টেম এখনো কর্মজীবী মা-বাবার কথা মাথায় রেখে সাজানো হয়নি। বেশিরভাগ স্কুল দুপুর ১২টা বা ১টায় ছুটি হয়, যেখানে অফিস শেষ হয় বিকেলে। এই মাঝখানের সময়টুকুতে বাচ্চাকে কোথায় রাখা হবে—এই দুশ্চিন্তা অনেক মেধাবী নারীকে ঘরবন্দী করে ফেলছে।
নিরাপদ যাতায়াতের অভাব:
বাসার কাছাকাছি মানসম্মত স্কুল না থাকা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ স্কুল বাস সার্ভিস না থাকা একটি বড় বাধা। ফলে শিশুকে স্কুলে আনা-নেওয়ার পুরো দায়িত্বটি পরোক্ষভাবে মায়ের কাঁধেই এসে পড়ে, যা তার কর্মঘণ্টাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ডে-কেয়ারের আকাল:
মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী ডে-কেয়ার সেন্টার আমাদের দেশে এখনো সোনার হরিণ। অনেক অফিসে ডে-কেয়ার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার চিত্র ভিন্ন। ফলে নিরাপদ কারো কাছে সন্তানকে রাখতে না পেরে পেশাজীবী মা তার ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতে বাধ্য হন।
অর্থনৈতিক লোকসান ও মেধার অপচয়:
এটি কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং একটি জাতীয় অপচয়। একজন শিক্ষিত ও দক্ষ নারী যখন মাঝপথে কাজ ছাড়েন, তখন রাষ্ট্র ও পরিবারের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ (শিক্ষার পেছনে ব্যয়) কোনো আর্থিক রিটার্ন দিতে পারে না। মেধার এই অপচয় জিডিপিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা হয়তো আমরা এখনো টাকার অঙ্কে পুরোপুরি মেপে দেখছি না।
নারীকে মূলধারার অর্থনীতিতে ধরে রাখতে হলে কেবল নীতিমালায় পরিবর্তন আনলেই হবে না, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার:
স্কুলগুলোতে ‘আফটার স্কুল কেয়ার’ বা ফুল-টাইম স্কুলিং ব্যবস্থা প্রবর্তন।
নিরাপদ ও সরকারি তদারকিতে থাকা স্কুল বাস সার্ভিস চালু করা।
অফিসগুলোতে বাধ্যতামূলক এবং কার্যকরী ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ঘর এবং সন্তানের দায়িত্ব কেবল নারীর—এই সামাজিক মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন। সত্যি কথা বলতে, অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠীকে ঠেলে পরিবারের কাজের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া সুস্থ রাষ্ট্রের কাজ নয়। এ বিষয়ে আরও মোটিভেশনাল প্রজেক্ট দরকার। নারী-পুরুষ সবার মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন জরুরি। ‘ভাবী’ কালচার থেকে নারীদেরও বের হতে হবে। স্বনামে জাগ্রত না হলে জেনারেশন বাই জেনারেশন ওই চারদেয়ালের ভেতর থেকে অর্থনৈতিক অপচয় বাড়বে বৈ কমবে না।
