মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ না থামলে বাংলাদেশের কী হবে ?
ইরান-ইসরায়েল আর আমেরিকার যুদ্ধে বাংলাদেশে সম্ভাব্য ক্ষতির হিসেব কষেছেন নাজিয়া সাকুর
ইরান যুদ্ধের ১০ দিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু থামার যেন কোন নাম নেই কারও! যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েল আর ইরান তিন পক্ষই নিজেদের সামরিক শক্তি দেখাতে ব্যস্ত।
কিন্তু কী হবে যদি এ যুদ্ধ এভাবে চলতে থাকে? দূর দেশগুলোর এই যুদ্ধের মাশুল কেন গুণতে হবে বাংলাদেশের মতো একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশকেও?
আসুন একটু হিসেব কষি।

ইরানের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুব বেশি নয়; এক কোটি ডলারের একটু বেশি। যার প্রায় পুরোটাই রপ্তানি খাতে । তবে টাকার অঙ্কটা ছোট মনে হলেও আমদানি নির্ভরতার জন্য বাংলাদেশকেও পড়তে হবে ভূরাজনৈতিক এই যুদ্ধের বেড়াজালে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের আমদানি নির্ভর জ্বালানি খাত। কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান থেকে এলএনজি ও এলপিজি আনে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইরান। বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম।

এরইমধ্যে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১শ ডলারে পৌছেছে। জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এড হির্স মনে করছেন,ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আর ইজরায়েলের এই আগ্রাসন লম্বা সময় ধরে চললে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২শ ডলারে পৌছুতে পারে।
বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানি তদারকি করে বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বিপিসিকেও বেশি দামেই কিনতে হয়। এই দাম সমন্বয় করতে হলে, হয় সংস্থাটি ভর্তুকি বাড়াবে, নয়তো ভোক্তাদের ওপর বাড়তি মূল্য চাপাবে। যা মূল্যস্ফীতি বাড়াবে।
তাছাড়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজির দাম বাড়লে দেশে বিদ্যুত উত্পাদন খরচও বাড়বে। বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে গেলে আবার শিল্প উত্পাদন খরচ বাড়ে। আর নয়তো ভর্তুকির ওপর চাপ পড়বে।
কার্যকর জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অভাবে প্রায় পুরোপুরি আমদানি নির্ভর বাংলাদেশকে তাই পড়তে হবে ঝুঁকির মুখে।
এছাড়া সুয়েজ খাল দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় লোহিত সাগর পার হয়ে পণ্য আনা-নেয়া করতে হবে্ । কিন্তু এ পথে আছে নিরাপত্তা ঝুঁকি । তাই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী জাহাজগুলো বিকল্প পথে আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে যাওয়া-আসা করে। এতে সময় যেমন বেশি লাগে তেমনি ব্যয়ও বাড়ে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি বাণিজ্যে।
তাছাড়া যুদ্ধের সময় ভোক্তাদের ক্রয় সক্ষমতা কমে যায়। যার প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি শিল্পে।
আকাশ সীমা বন্ধ থাকায় আপাতত কার্গো বিমান চলছে না মধ্যপ্রাচ্যে। ফলে বন্ধ রয়েছে জরুরি পণ্য রপ্তানি। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ লম্বা সময় ধরে চলতে থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার হারাতে পারে আমাদের রপ্তানিকারকরা।
এদিকে, বাংলাদেশের শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্য। এ অঞ্চলে কাজ করা শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির বড় চালিকা শক্তি। সংঘাত দীর্ঘমেয়াদী হলে ঝুঁকিতে পড়বে রেমিট্যান্স প্রবাহ। ফলে চাপ বাড়বে রিজার্ভের ওপর। আর শেষমেষ এই চাপ সামলাতে হবে জ্বালানি আমদানির বেলায়। শুধু তাই নয় রেমিট্যান্স কমলে বিপাকে পড়বে প্রবাসী আয় নির্ভর পরিবারগুলোও।
এরইমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে সরকার। যার অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঈদের ছুটি এগিয়ে আনা সহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সংযোগ অব্যাহত রাখতে এবং দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আপতকালীন সহায়তা চেয়েছে সরকার।
এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও যুদ্ধ না থামা পর্যন্ত বৈশ্বিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ঝুঁকি কমবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
