অস্ট্রেলিয়ার ১২৫ বছরের সামরিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। প্রথমবারের মতো দেশটির সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে যাচ্ছেন একজন নারী। লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুসান কয়েলের এই নিয়োগ কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সামরিক কাঠামোর বিবর্তনের একটি প্রতীক। সুসান কয়েল থেকে শুরু করে সারা বিশ্বে যারা প্রথম হয়ে পথ দেখিয়েছেন, তাঁদের গল্প নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুসান কয়েল আগামী জুলাই মাস থেকে অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ৫৫ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা ১৯৮৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ৩৯ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি সাইবার যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে কমান্ডিং রোল এবং আফগানিস্তানে লজিস্টিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেসের মতে, “সুসান যা দেখতে পেয়েছেন, তা-ই হতে পেরেছেন,” আর এখন তিনি সারা বিশ্বের তরুণীদের জন্য সেই দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সুসান কয়েল ১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরার ‘রয়্যাল মিলিটারি কলেজ, ডান্ট্রুন’ (Royal Military College, Duntroon) থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। তিনি একজন বিশেষজ্ঞ সিগন্যাল অফিসার হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যন্ত ঈর্ষণীয়:
তিনি তিনটি ভিন্ন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম’ সম্পন্ন করেছেন। ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি ওয়ার কলেজ থেকে সামরিক কৌশল ও পরিচালনার উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
প্রথম নারী কমান্ডার হিসেবে রেকর্ড (মধ্যপ্রাচ্য)
সুসান কয়েল কেবল এখন সেনাপ্রধান হিসেবে ইতিহাস গড়ছেন না, তিনি ২০২০ সালেই একটি বিশাল মাইলফলক অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রথম কোনো নারী, যিনি মধ্যপ্রাচ্যে অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত সামরিক অভিযানের কমান্ডার (Commander of Joint Task Force 633) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং পদ ছিল, যেখানে আফগানিস্তান ও ইরাকে মোতায়েন করা হাজার হাজার সৈন্যের অপারেশনাল লজিস্টিকস এবং কৌশলগত কমান্ড তাঁর হাতে ছিল।
আধুনিক ও সাইবার যুদ্ধের বিশেষজ্ঞ
প্রথাগত যুদ্ধের পাশাপাশি সুসান কোয়েলকে আধুনিক বা ‘ফিফথ জেনারেশন ওয়ারফেয়ার’ (5th Generation Warfare) এর বিশেষজ্ঞ ধরা হয়। সেনাপ্রধান হওয়ার আগে তিনি ‘চিফ অফ জয়েন্ট ক্যাপাবিলিটিজ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই পদে তাঁর মূল কাজ হলো: সাইবার ডিফেন্স: অস্ট্রেলিয়ার সামরিক নেটওয়ার্ক রক্ষা করা। স্পেস ক্যাপাবিলিটি: মহাকাশ প্রযুক্তিকে সামরিক কাজে ব্যবহার। ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার: তথ্যযুদ্ধের যুগে প্রতিপক্ষের অপপ্রচার মোকাবিলা।
সুসান কেবল ডেস্কে বসে কাজ করেননি, তিনি সরাসরি সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করেছেন:
পূর্ব তিমুর ও সলোমন দ্বীপপুঞ্জ: এই অঞ্চলের শান্তিরক্ষা মিশনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আফগানিস্তান: যুদ্ধের উত্তাল সময়ে তিনি সেখানে অপারেশনাল লজিস্টিকস এবং যোগাযোগের দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলেছেন।
৫৫ বছর বয়সী সুসান কয়েল বাস্তব জীবনেও একজন সফল নারী। তিনি তিন সন্তানের মা। তাঁর স্বামী নিজেও একজন সামরিক কর্মকর্তা (রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স-এর একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল)।
কর্মজীবনে তাঁর দর্শন হলো—”You can’t be what you can’t see” (আপনি যা দেখতে পান না, তা হতেও পারেন না)। অর্থাৎ, উচ্চপদে নারীদের অবস্থান দেখে যেন নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয়, এটিই তাঁর মূল লক্ষ্য।
জুলাই ২০২৬-এ তিনি যখন দায়িত্ব নেবেন, তখন তাঁর অধীনে থাকবে অস্ট্রেলিয়ার স্থলবাহিনীর কয়েক হাজার সৈন্য এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম।
