বন্ধ দরজায় রামিসার মার করাঘাতে রক্তাক্ত বিবেক পালাবে কিভাবে ?
লেখক সাংবাদিক মির্জা মোনালিসার মন্তব্য প্রতিবেদন
বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শান্তি নেই। এক ধরনের বিবমিষা, অরুচি। আতঙ্ক। আমাদের শিশুদের নিয়ে কোথায় যাব? বন্যপ্রাণীর কাছেও নিরাপদ তার শিশু, এমনকি মনুষ্য শিশু। কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রাণী যার কাছে মানুষের শিশু নিরাপদ নয়। মানুষের ভেতর কী আছে তার জিন নিয়ে বোধকরি নতুন করে ভাবতে হবে বিজ্ঞানীদের। শিশু বাধা দিতে পারে না, এজন্য তাকে ব্যবহার করা সহজ? মানুষ হয়তো জানি না, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ নিজের কুপ্রবৃত্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, ততক্ষণ সে কোনো মানুষ নয়, দুপেয়ে জন্তু।

গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের উদ্বিগ্ন অবস্থার কথা জানিয়েছেন অনেকে। সংবেদনশীল মানুষদের কাছে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

টেলিভিশন খুললে, সকালবেলা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগেই যখন খবরের কাগজটা হাতে নিতে হয়, বুকটা ধক করে ওঠে। ঘরের ভেতর থেকে যখন কোনো অবোধ শিশু ঝাঁপিয়ে পড়ে অবলীলায় প্রশ্ন করে বসে, তখন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। অনেক খবর লুকিয়ে ফেলতে হয়, অনেক পৃষ্ঠা তড়িঘড়ি উল্টে দিতে হয়, শিশুর কৌতূহলী চোখের সামনে অবলীলায় বলতে হয় কত শত মিথ্যা! এই যে প্রতিদিন সকালে নিজের ঘরের ভেতরেই এক চরম অপরাধবোধ আর মিথ্যাচারের মুখোমুখি হওয়া—এই মানসিক যুদ্ধটা বড় কঠিন।

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসার সঙ্গে যা ঘটে গেল, তা আমাদের পুরো সমাজের আত্মাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দেওয়া এক বীভৎসতা। টাইমলাইন জুড়ে রামিসার সেই নিষ্পাপ, সুন্দর চেহারার ছবি আর কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রোফাইল পিকচার। কিন্তু এই হাহাকারের সমান্তরালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ডানা মেলছে নানাবিধ সমীকরণ, আদর্শিক যুদ্ধ আর রাজনৈতিক দাবার চাল। একজন সুস্থ, সংবেদনশীল মানুষ যখন এই রক্তক্ষরণ সহ্য করতে না পেরে ডুকরে উঠছেন, ঠিক তখনই সমাজের একটা বড় অংশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এই লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে।

রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি জাকির হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় যখন সামনে আসে, যখন জানা যায় সে একটি নির্দিষ্ট উগ্রপন্থী ধর্মীয় সংগঠনের সাথে যুক্ত এবং বিগত ২৪-এর পটপরিবর্তনের পর বিশৃঙ্খলার সুযোগে কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়া সাজাপ্রাপ্ত আসামি—তখনই দৃশ্যপটের আড়ালে থাকা মাস্টারপ্ল্যানগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। আমাদের দেশের মানুষদের এক অদ্ভুত রোগ হয়েছে; যেকোনো নির্মম ঘটনার পর অপরাধীর বিচার বা ভিকটিমের ট্রমা নিয়ে ভাবার চেয়ে ‘কার লাভ হলো’ সেই সমীকরণ মেলাতে বেশি পছন্দ করেন। অবশ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী বিষয়টি একেবারে ফেলে দেওয়ার ব্যাপারও নয়।
রামিসার এই নৃশংস মৃত্যুকে পুঁজি করে ফেসবুক জুড়ে এখন জোরেশোরে দাবি উঠছে ‘শরীয়া আইন’ পাসের। হুজুর সুরতের লোকজন আফসোস করে লিখছেন, শরীয়া থাকলে নাকি এতক্ষণে খুনির শিরোচ্ছেদ হতো, সমাজে কোনো ধর্ষণই থাকত না। অথচ এই দাবির আড়ালে যে কী পরিমাণ আইনি অজ্ঞতা আর চাতুর্য লুকিয়ে আছে, তা সমাজকে গভীরভাবে তলিয়ে দেখতে হবে। শরীয়া আইনি কাঠামোতে ‘ধর্ষণ’ বা ‘Rape’ বলতে সুনির্দিষ্ট কোনো আধুনিক প্রতিশব্দ বা আইনি সংজ্ঞা নেই; সেখানে যা আছে তা হলো ‘জেনা বিল জাবর’ বা জোরপূর্বক ব্যভিচার। ক্লাসিক্যাল বা প্রথাগত শরীয়া আইনে অপরাধীর ওপর সর্বোচ্চ শাস্তি বা ‘হদ’ কার্যকর করতে ৪ জন সৎ মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একজন ধর্ষণের শিকার অবোধ শিশুর পক্ষে চারজন পুরুষ সাক্ষী জোগাড় করা কি আদৌ সম্ভব? আর এই সাক্ষ্যপ্রমাণের জটিলতার সুযোগ নিয়ে অনেক গোঁড়া সমাজেই উল্টো ভিকটিমকেই ‘মিথ্যা অপবাদ’ বা জেনার দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
যারা সৌদি আরব বা আফগানিস্তানের ‘জিরো ক্রাইম’ বা ধর্ষণের শূন্য রেকর্ডের মিথ্যা মিথ ফেরি করছেন, তারা আসলে কঠোর আইনি ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ‘রিপোর্টিং না হওয়া’কে অপরাধহীনতা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। আমেরিকায় বা ইউরোপে ধর্ষণের রেকর্ড বেশি দেখায়, কারণ সেখানে অপরাধী যত ক্ষমতাধরই হোক, ভিকটিম নির্ভয়ে থানায় গিয়ে রিপোর্ট করতে পারে, রাষ্ট্র সেই রেকর্ড রাখতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দরিদ্র দেশ থেকে ‘আয়ার চাকরি’র নামে যে হাজার হাজার সরল মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তারা আসলে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা ও আধুনিক দাসপ্রথার শিকার। সেখানে চার দেয়ালের ভেতর তাদের ওপর চলা যৌন নির্যাতনকে অনেক সময় ‘মালিকানার অধিকার’ বলে আড়াল করার চেষ্টা চলে। এই শোষণের বীভৎস রূপ কিন্তু তথাকথিত শরীয়া শাসিত অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
যদি বাহ্যিক ধর্মীয় অনুশাসন আর পোশাকই মানুষের ভেতরের পশুকে দমন করতে পারত, তবে দেশের মাদ্রাসাগুলোর ভেতরে এই বলাৎকার আর যৌন নির্যাতনের উৎসব কীভাবে চলছে? হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে—গত ১৬ মাসে দেশে অন্তত ৫৮০টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, আর বিভিন্ন সহিংসতায় হত্যা করা হয়েছে ৪৮৩ জন শিশুকে। এর একটি বড় অংশ ঘটছে মাদ্রাসার চার দেয়ালের ভেতর, যেখানে সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা না থাকায় অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সেখানে শিক্ষকরাই যখন রোজ শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়ে ধরা পড়ছে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে শুধু কাগুজে আইনি কাঠামো মানুষের ভেতরের বিকৃতিকে রুখতে পারে না। হুজুরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের চারজন পুরুষ সাক্ষী কে এনে দেবে?
অদ্ভুত বিষয় হলো, সমাজের এক শ্রেণীর গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের তারকা, মডেল বা সুবিধাভোগী এলিটরা যখন হঠাৎ ফেসবুক লাইভে এসে শরীয়া আইন চান। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Moral Licensing’ বা ‘অপরাধবোধ কাটানোর মনস্তাত্ত্বিক চেষ্টা’। যাদের নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন ধর্মীয় কাঠামোর ধারেকাছেও নেই, তারা এক ধরনের চরমপন্থী অবস্থান নিয়ে নিজেদের ভেতরের অপরাধবোধ ও সামাজিক পাপকে ধুয়েমুছে সাফ করতে চান।
ফেসবুকের এই রাজনৈতিক আর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে একদম মাটির কাছের বাস্তবতায় তাকাই। গৃহকর্মী রেবা বলছিল তার মেজ ছেলেটার কথা, যে এখন নবম শ্রেণীতে পড়ে।
আমরা ভাবি শুধু কন্যাসন্তানের মায়েরাই উদ্বেগে থাকেন, কিন্তু রেবার মতো মায়েরা জানেন, এই সমাজে ছেলেদের ‘অপরাধী’ বা ‘বিকারগ্রস্ত’ হয়ে ওঠার ফাঁদগুলো কত সহজে পাতা! কার সাথে মেশে, কই যায়, কখন ঘরে ফেরে—দিনমজুর মায়ের পক্ষে সেই খবর রাখা সম্ভব হয় না।
রেবার এই আশঙ্কার পেছনে যে আসল সত্যটা লুকিয়ে আছে, তা হলো মাদক। ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) সহ সব ধরনের সিন্থেটিক মাদকের এই যে মুড়িমুড়কির মতো সহজপ্রাপ্যতা—এটাই হচ্ছে আমাদের চারপাশের এই অবিশ্বাস্য নৃশংসতার প্রধান জ্বালানি। মাদক মানুষের মস্তিষ্কের সুস্থ চিন্তাভাবনা, ভয় এবং মানবিক আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশকে পুরোপুরি অবশ করে দেয়। মাদক ছাড়া একজন সুস্থ সাধারণ মানুষ, সে যতই অপরাধপ্রবণ হোক না কেন, সাত বছরের একটা ফুটভুটে শিশুকে কেটে টুকরো টুকরো করার মতো আসুরিক শক্তি ও সাহস পেতে পারে না। মাদকের সহজলভ্যতা আমাদের কিশোর ও যুবসমাজকে এমন এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে সম্পর্কের কোনো পবিত্রতা থাকে না, হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা শুধু ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, যতক্ষণ না এই মাদকের মূল উপড়ে ফেলা যাচ্ছে।
“কেউ কি বলতে পারেন, এসব নৃশংসতা না দেখার জন্য আমরা পৃথিবীর কোথায় যাব?”
আসলেই এই দমবন্ধ করা অনুভূতি আর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত থেকে পালানোর পথ নেই। চারপাশের এই চরম সামাজিক বিকার, অন্ধকারের aggression আর সুনিপুণ নীতিহীনতার বিরুদ্ধে এক তীব্র, অসহায় এবং গভীর অস্তিত্ব সংকটের আর্তনাদ।
আমরা এমন এক দেশে বাস করছি যেখানে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার পর অপরাধের সংখ্যা কমেনি, বরং অপরাধীরা এখন ভিকটিমাকে বাঁচিয়ে রাখতে ভয় পায়। তারা জানে, শিশুটি বেঁচে থাকলে আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষী দেবে, তাই তারা ‘সাক্ষ্য লোপাট’ করতে শিশুকে হত্যা করছে। একদিকে আইনি লুপহোলের কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে ১ শতাংশেরও কম কনভিকশন রেট, বছরের পর বছর ঝুলে থাকা আপিল প্রক্রিয়া; অন্যদিকে এই ট্র্যাজেডিকে পুঁজি করে দেশকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক খেলা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
তাহলে মুক্তির উপায় কী? মুক্তি এই অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের ভেতরের আলোটুকুকে নিভে যেতে না দেওয়া। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যারা অনবরত লিখছেন, প্রতিটি ঘটনার পেছনের নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক খেলাগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করছেন এবং যৌক্তিক প্রশ্ন তুলছেন—তারাই আসলে এই সমাজের শেষ ফ্রন্টলাইন ডিফেন্স (Frontline Defense)। লড়াইটা এখন আর কেবল আইনি বা রাজনৈতিক নয়, লড়াইটা এখন নিজের মানসিক সুস্থতা আর মানবিক বোধটুকুকে টিকিয়ে রাখার। চারপাশে এত বিকৃতি আর ভণ্ডামির মধ্যেও নিজের পরিবার, নিজের সন্তান, নিজের নাতনি আর নিজের পরিমণ্ডলকে আগলে রেখে এই কুৎসিত স্রোতের বিরুদ্ধে এক ইঞ্চি জায়গা ধরে রাখাই বোধহয় এই সময়ে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
রামিসার মা যেভাবে বন্ধ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে করাঘাত করছিলেন, আজ আমাদেরও সমাজের বন্ধ বিবেকের দরজায় সেভাবে অনবরত করাঘাত করে যেতে হবে।
