একটি সংবাদমাধ্যম কখন হুট করে লাইভে আসে? নিশ্চয়ই কোনো জরুরি প্রয়োজনে, ব্রেকিং নিউজের খাতিরে কিংবা তাৎক্ষণিক জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা দেশবাসীকে জানাতে। এমন একটি জরুরি মুহূর্তে একজন সংবাদকর্মীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো দ্রুততম সময়ে খবরটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তখন কি সে ড্রেস কোড মেলাতে বসবে, নাকি দ্রুত লাইভে যাবে?
বাস্তবতা হলো, সংবাদকক্ষে বা মাঠে কাজ করার সময় একজন কর্মী সম্পূর্ণ ‘ওয়ার্কিং মুড’-এ থাকেন। অর্থাৎ, তিনি যে মার্জিত পোশাকটি পরে সকালে অফিসে এসেছেন, সেই পোশাকেই তাঁকে তাৎক্ষণিক লাইভে আসতে হতে পারে। একজন পেশাদার সংবাদ উপস্থাপক বা প্রতিবেদক খুব ভালো করেই জানেন যে ক্যামেরার সামনে কীভাবে শালীন ও মার্জিত উপায়ে দাঁড়াতে হয়। এখানে কৃত্রিম কোনো নিয়মের বেড়াজাল তৈরি করা কেবল কাজের গতিকেই শ্লথ করে না, বরং সংবাদমাধ্যমের মূল চরিত্রের পরিপন্থী।
বড়জোর প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনায় এতটুকু বলা যেতে পারে যে, ক্যামেরার সামনে ক্যাটক্যাটে বা অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরা পরিহার করুন, যা সংবাদের বিষয়ের সাথে যায় না (যেমন: শোকের খবরে লাল রঙ)। কিন্তু সেই ন্যূনতম পেশাদারিত্বের ধারণা ধরে, কর্তৃপক্ষ সোজা চলে গেলেন নারীর টিপ আর ওড়নায়!
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতারের একটি অফিস আদেশ (নোটিশ) ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশ বেতারের কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থা থেকে গত মে মাসে জারি করা এই নোটিশে ফেসবুক লাইভে সংবাদ প্রচারের সময় উপস্থাপকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘ড্রেস কোড’ বা পোশাকনীতি মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টে এটিকে সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা মনে হলেও, নারী উপস্থাপকদের পোশাক ও সাজসজ্জা নিয়ে এতে যে ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, তা নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে। বিশেষ করে, নারীর ওড়না ও টিপ নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তটিকে কোনোভাবেই প্রগতিশীল বা নারীবান্ধব বলা চলে না।
নোটিশের ছকে স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে— নারী সংবাদ উপস্থাপকদের ক্ষেত্রে ওড়না ছাড়া সালোয়ার-কামিজ পরা যাবে না এবং ওড়না একপাশে রাখা যাবে না। সেই সাথে আলাদা করে যোগ করা হয়েছে এক অদ্ভুত নিষেধাজ্ঞা: বড় সাইজের টিপ পরা যাবে না।
বাংলাদেশ বেতারের এই নোটিশটি দেখার পর প্রথমেই মনে হলো একটি আধুনিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে নারীর পোশাকের স্বাধীনতা বা সংস্কৃতির প্রকাশকে সংকুচিত করা হচ্ছে কেন? বড় সাইজের টিপ পরলে সংবাদের গুরুত্ব কীভাবে কমে যায়, কিংবা ওড়না একপাশে রাখলে সংবাদ উপস্থাপনায় কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়— তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা এই নোটিশে নেই।
তবে এই নোটিশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি পোশাকের কড়াকড়ি নয়; নারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর।
যে নারী নিজে বহু লড়াই-সংগ্রাম করে, নিজের মেধা ও যোগ্যতা প্রমাণ করে আজ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বসার অধিকার পেয়েছেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত অবচেতনভাবেই হোক বা সিস্টেমের চাপে পড়েই হোক, সেই একই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার পাহারাদার হিসেবে আবির্ভূত হন। ক্ষমতার চেয়ারে বসেও যখন একজন নারী নিজের ভেতরের স্বাধীন চিন্তাকে জাগ্রত করতে পারেন না, তখন তা পুরো নারী সমাজের জন্যই এক বড় ধরণের ধাক্কা।
বাঙালি নারীর সাজের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হলো টিপ। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ এবং নারীর চিরায়ত সৌন্দর্যের এক অনন্য ঐতিহ্য। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও এই জনপদের মুক্তিকামী বাঙালি নারীরা কপালে লাল টিপ পরে রাজপথে নেমেছিলেন এবং পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। টিপ এখানে কেবল সাজগোজ ছিল না, টিপ ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলনের এক নীরব প্রতীক। আজ সরকারি একটি গণমাধ্যমে যখন সেই টিপের আকার বা সাইজ মেপে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তখন তা কেবল বেদনাদায়কই নয়, বরং সংস্কৃতির ওপর এক ধরনের পরোক্ষ আঘাত বলে মনে হয়।
এদিকে, ওড়না নিয়ে যে চুলচেরা বিশ্লেষণ এই নোটিশে করা হয়েছে, তা আরো অবমাননাকর।
ওড়না দুই কাঁধে থাকবে নাকি এক কাঁধে জড়িয়ে থাকবে, তা একজন প্রাপ্তবয়স্ক, শিক্ষিত ও সচেতন নারীর নিজস্ব স্বাচ্ছন্দ্য আর রুচির ব্যাপার। একজন পেশাদার সংবাদ উপস্থাপক খুব ভালো করেই জানেন ক্যামেরার সামনে নিজেকে কীভাবে মার্জিত ও প্রফেশনাল উপায়ে উপস্থাপন করতে হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান যখন ওড়নার পজিশন ঠিক করে দিতে বাধ্য করে, তখন তা আর পেশাদারিত্ব থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রকাশ্য মানসিক নিপীড়ন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কনটেন্টের মান, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, ভাষাগত শুদ্ধতা কিংবা সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে চরম সংকটে নিমজ্জিত, তখন তাদের প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় নারীর পোশাক।
এই দেশে নারীর পোশাক নিয়ে আলোচনার এই অন্তহীন ও ক্লান্তিকর বৃত্ত থেকে আমরা মনে হয় কখনই বের হতে পারবো না।
এ সম্পর্কিত
You might also like
সম্পাদক :মোঃ শাহজালাল
২০২৫ © ব্যানারনিউজবিডি কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
🚧 এই সাইটটি বর্তমানে নির্মাণাধীন 🚧
২০২৫ © ব্যানারনিউজবিডি কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
🚧 এই সাইটটি বর্তমানে নির্মাণাধীন 🚧
You cannot print contents of this website.
