নয়াদিল্লি: ভারতের রাজধানী দিল্লির মালব্য নগর এলাকায় একটি পাঁচতলা আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন বিদেশিসহ অন্তত ২১ জন। আহত আরও অনেকে হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এই ঘটনায় পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন বলে নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন নিশ্চিত করেছে।ভারতীয় সময় বুধবার সকাল ৯টার দিকে আবাসিক হোটেলটিতে আগুন লাগে। এ সময় হোটেলের অধিকাংশ অতিথিই ঘুমাচ্ছিলেন।

ঘনবসতিপূর্ণ ও সংকীর্ণ গলির ভেতরে অবস্থিত ‘ফ্লরিশ স্টে’ নামের এই ভবনটিতে ‘মিকাসা ইন’ নামক একটি আবাসিক হোটেল এবং এর বেসমেন্টে ‘লেমন গ্রিন’ নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বেসমেন্টের ওই রেস্তোরাঁ থেকেই মূলত ভবনটিতে আগুন লাগে এবং তা দ্রুত ‘মিকাসা ইন’ হোটেলেও ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলের অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে বলে ধারণা করছে প্রশাসন।
দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন জানিয়েছে, আগুনে যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৩ জন সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতালে এবং অপর ২ জন সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসা পর্যটনের জন্য সুপরিচিত সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতালের কাছাকাছি হওয়ায় এই হোটেলটিতে মূলত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আসা বিদেশি নাগরিকরাই বেশি অবস্থান করছিলেন।
হাইকমিশন থেকে জানানো হয়েছে, তারা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে এবং আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছে হাইকমিশন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল আনুমানিক ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ হোটেলের বেসমেন্টে অবস্থিত রেস্তোরাঁ থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ঘন কালো ধোঁয়া পুরো পাঁচতলা ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটিতে যাতায়াতের জন্য মাত্র একটি সংকীর্ণ পথ থাকায় ভেতরে আটকা পড়েন অতিথিরা।
বাঁচার কোনো পথ না পেয়ে আতঙ্কিত অনেক অতিথিকে জানলার কাচ ভেঙে নিচে ঝাঁপ দিতে দেখা যায়। নিচে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা ও কাছাকাছি একটি গদির দোকানের মালিকরা দ্রুত রাস্তায় গদি পেতে দেন। এ সময় এক নারী তাঁর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে তৃতীয় তলা থেকে ঝাঁপ দেন। স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় মা ও শিশু বেঁচে গেলেও ওপর থেকে পড়ার তীব্র অভিঘাতে অনেকেই গুরুতর জখম হয়েছেন। উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে দিল্লি পুলিশের অন্তত ১০ জন সদস্যও আহত হয়েছেন।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ও দিল্লির ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভবনটিতে ভয়াবহ নিরাপত্তা ত্রুটি ছিল। মাত্র ৬টি রুম পরিচালনার অনুমতি নিয়ে বেসমেন্টসহ পুরো ভবনে অবৈধভাবে ২৫টি রুম চালানো হচ্ছিল। পুরো ভবনে কোনো অগ্নি-নিরাপত্তা ছাড়পত্র (Fire NOC) ছিল না। এই চরম অবহেলার কারণে ভবন মালিক লভকেশ বাজাজের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর (কালপেবল হোমিসাইড) মামলা করেছে দিল্লি পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত মালিক পলাতক রয়েছেন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, “দিল্লির মালব্য নগরে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক।” প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল (PMNRF) থেকে নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ রুপি এবং আহতদের ৫০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জরুরি সংস্থাসমূহ কাজ করছে।
ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে গুরুতর আহত বেশ কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
