কিচেন ক্যাবিনেট’ ও উপদেষ্টাদের ‘অসহায়ত্ব’: দায়মুক্তির সুযোগ কতটুকু?

15

 

 

- Advertisement -

- Advertisement -

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে কারা ছিলেন, তা দেশের মানুষ ভালো করেই জানে। কিন্তু সেই সরকারের ভেতরেই নাকি ছিল আরেকটি ‘অদৃশ্য সরকার’ বা সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামো! যমুনা টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেনের বিস্ফোরক মন্তব্য এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় একটি সাত সদস্যের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সক্রিয় ছিল এবং প্রতি মঙ্গলবার যমুনাতে এই কিচেন ক্যাবিনেটের গোপন বৈঠক হতো।

 

সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন কিংবা অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মুখ খোলার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি শব্দ জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে—’কিচেন ক্যাবিনেট’। তারা বলছেন, সরকারের ভেতরের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বা কিচেন ক্যাবিনেটই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিত; অন্য উপদেষ্টারা ছিলেন কেবলই দর্শক। আসিফ নজরুল কিংবা ফরিদা আখতার বলেছেন, তারা এতে ছিলেন না।

 

তাহলে কারা ছিলেন এই কিচেন ক্যাবিনেটে?  এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে আসিফ মাহমুদ দাবি করেছেন, তিনি এই কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্য ছিলেন না। এমনকি ভোটের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া সেই বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে নিজের এবং তার দল এনসিপির সংশ্লিষ্টতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তিনি। উল্টো দায় চাপিয়েছেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী (তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা) খলিলুর রহমানের ওপর এবং অভিযোগ করেছেন যে, এই চুক্তি আসলে বিএনপির পরামর্শে তারেক রহমান করিয়েছেন।

 

হঠাৎ করে ক্ষমতার ভেতরের এই কাদা ছোড়াছুড়ি এবং গুরুতর সব অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে সরগরম গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তবে সবচেয়ে বড় যে নৈতিক ও রাজনৈতিক জিজ্ঞাসাটি সামনে আসে—এই ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা ‘political lobbying’-এর দোহাই দিয়ে কি আসলেই দায় থেকে পার পাওয়া সম্ভব?

 

‘কিচেন ক্যাবিনেট’ কোনো সাংবিধানিক শব্দ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক রূপক। সহজ কথায়, একটি দেশের সরকার পরিচালনায় যারা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রী বা উপদেষ্টা থাকেন, তাদের বাইরে বা তাদের মধ্য থেকে খুব ছোট একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী যখন তৈরি হয়—যারা সরকার প্রধানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং পর্দার আড়াল থেকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করেন, তাদেরকেই ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বলা হয়।

 

১৮৩০-এর দশকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সময় এই শব্দটির উৎপত্তি। তিনি তার আনুষ্ঠানিক মন্ত্রীসভার চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের সাথে রান্নাঘরে (Kitchen) বসে অনানুষ্ঠানিক আড্ডায় রাষ্ট্রের বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতেন। সেখান থেকেই এই ধারণার জন্ম। একটি জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থায় এই ধরনের কিচেন ক্যাবিনেট থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন, কিন্তু এই অদৃশ্য গোষ্ঠীর কোনো জবাবদিহিতা থাকে না।

 

তৌহিদ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন কিংবা বর্তমানের আসিফ মাহমুদ—সাবেক উপদেষ্টারা এখন যেভাবে নিজেদের ‘অজ্ঞতা’ বা ‘অসহায়ত্বের’ কথা প্রকাশ করছেন, তা এক বড় প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনার একটি মূল নীতি হলো ‘সামষ্টিক দায়িত্বশীলতা’ (Collective Responsibility)। আপনি যখন সরকারের একটি শীর্ষ পদে বসার জন্য শপথ নিচ্ছেন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন এবং সেই পদে বহাল থাকছেন, তখন সেই সরকারের প্রতিটি ভালো এবং মন্দ সিদ্ধান্তের দায় আইনি ও নৈতিকভাবে আপনার ওপরও বর্তায়।

 

আইনের একটি সুপরিচিত আপ্তবাক্য আছে—‘আইন না জানা যেমন অপরাধের শাস্তি থেকে মুক্তির উছিলা হতে পারে না, তেমনি রাষ্ট্রে নিজের দায়িত্ব না জানা বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে অজ্ঞ থাকা কোনো উপদেষ্টার জন্য ঢাল হতে পারে না।’ আসিফ নজরুল বা ফরিদা আখতারের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, কিংবা আসিফ মাহমুদের মতো ছাত্রনেতারা কেউ সাধারণ নাগরিক নন। তারা যখন বলেন যে তারা অনেক কিছু জানতেন না বা সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিত, তখন তা তাদের নির্দোষ প্রমাণ করে না, বরং তাদের পদের অযোগ্যতা বা দায়িত্বে অবহেলাকেই স্পষ্ট করে তোলে।

 

সাবেক উপদেষ্টাদের অনেকের মুখে এখন শোনা যাচ্ছে যে, তারা পরিস্থিতি দেখে কয়েকবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের পদত্যাগ করতে দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ নিজেকে ‘উদ্বাস্তু উপদেষ্টা’ হিসেবেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

 

প্রশ্ন হলো, একজন শীর্ষ নীতি-নির্ধারকের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কি অন্য কেউ আটকে রাখতে পারে? রাষ্ট্র যখন ভুল পথে হাঁটে, দেশের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো চুক্তি যখন চোখের সামনে ঘটে, তখন অনমনীয় অবস্থান নিয়ে পদত্যাগপত্র ছুড়ে ফেলে টেবিল থেকে উঠে আসাই একজন সত্যিকারের নীতিবান মানুষের পরিচয়।

 

‘আমাকে বারণ করা হয়েছিল তাই থেকে গেছি’—এই যুক্তি জনগণের কাছে কেবলই ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে থাকার বা পরবর্তী সময়ে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর একটি দুর্বল চেষ্টা।

 

তবে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে তীব্র পলিসি মেকিং বিভক্তি ছিল। সরকারের ভেতরেও একাধিক ক্ষমতার অক্ষ সক্রিয় ছিল এবং ছাত্র উপদেষ্টাদেরও অনেক ক্ষেত্রে ‘বাইপাস’ করা হতো।

 

কিন্তু ক্ষমতার সুসময় পার করে দিয়ে এখন ‘আমি অসহায় ছিলাম’ বা ‘সব দোষ অন্যের’ বলে কি জনগণের সহানুভূতি পাওয়া যাবে?

মনে রাখবেন, দেশের মানুষ তাদের কখনোই ইতিবাচকভাবে দেখবে না, যারা চোখের সামনে নীতিহীনতা বা ভুল হতে দেখেও ক্ষমতার অংশীদার হয়ে নীরব সম্মতি দিয়েছিলেন।

You might also like