কূটনীতিক নয় , রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে কেন ঢাকায় পাঠাচ্ছে দিল্লি ?

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মেঘ কাটানোর প্রথম বৃষ্টি হবে দীনেশ-তারেকের 'পার্সোনাল কেমিস্ট্রি' দিয়ে !

17

 

- Advertisement -

- Advertisement -

কূটনীতির দাবায় দিল্লি এবার এমন এক চাল চেলেছে যা প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক ব্যাকরণকে ভেঙে ফেলেছে। বাংলাদেশের নতুন হাই কমিশনার হিসেবে এমন একজনের নাম উঠে আসছে, যা কূটনৈতিক মহলে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি কোনো পেশাদার আমলা নন, নন কোনো ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট। তিনি ভারতের প্রাক্তন রেলমন্ত্রী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের ছায়াসঙ্গী—দীনেশ ত্রিবেদী। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ নিয়োগ মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনৈতিক ‘মাস্টার স্ট্রোক’। কেন একজন প্রশিক্ষিত পাইলট এবং সেতার অনুরাগী রাজনীতিককে বাংলাদেশ-ভারতের শীতল সম্পকের  সময়ে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে?
এজন্য দাঁড় করানো যাবে অন্তত কূটনৈতিক কূটচালের সাতটি হাইপোথিস ।

লন্ডনের গোপন কেমিস্ট্রিপু

দীনেশ ত্রিবেদীকে ঘিরে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি কিন্তু কোনো সরকারি ফাইলে নেই। বিভিন্ন সূত্র উদ্ধৃত করে   তারেক রহমান এবং দীনেশ ত্রিবেদীর এক বন্ধুত্বপুর্ণ  সম্পর্ক  নিয়ে এরই মধ্যে বেশ সোচ্চার হয়েছে ভারতীয় গনমাধ্যম। লন্ডনে থাকাকালীন তারেক রহমানের সাথে দীনেশ ত্রিবেদীর সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক ছিল না, ছিল পারিবারিক ও গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ। এমনকি তারা একই আবাসন ভবন শেয়ার করার মতো ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এই ব্যক্তিগত ‘কেমিস্ট্রি’ বা বন্ধুত্বই কি মোদী সরকারের তুরুপের তাস? যখন দুই দেশের সম্পর্ক এক রূঢ় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই পুরনো ব্যক্তিগত আস্থাকেই কি হাতিয়ার করতে চাইছে দিল্লি?

মমতা-জট ও তিস্তার চাবিকাঠি
বাংলাদেশ-ভারত- সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কাঁটার নাম—তিস্তা নদীর পানির হিস্যা। আর এ নিয়ে আকাংখিত চুক্তি না হওয়ার  জট পাকানোর অবস্থার মাঝে আছে  কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং থেকে নবান্ন অবদি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুঁয়েমির কারণে বছরের পর বছর ঝুলে আছে জলবন্টন চুক্তি। ঠিক এখানেই প্রাসঙ্গিক দীনেশ ত্রিবেদী। এক সময় তিনি ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এবং মমতার ডান হাত। মমতার রাজনীতির নাড়ি-নক্ষত্র তার চেয়ে ভালো আর কে জানেন? দিল্লি আশা করছে, ত্রিবেদী একদিকে ঢাকার দাবি যেমন বুঝবেন, তেমনি ”দিদিকে” বুঝিয়ে তিস্তা চুক্তির জট খোলার জাদুমন্ত্রটাও তিনি দিতে পারবেন। এবছর এই এপ্রিলেই গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, তাই সময় খুবই কম। দিল্লি আশা করছে, এই কূটনৈতিক দেয়াল ভাঙতে দিনেশ ত্রিবেদী হতে পারেন এক অনন্য ‘পলিটিক্যাল ব্রিজ’।

ভাষার জাদুতে মন জয়
একজন গুজরাটি হয়েও দিনেশ ত্রিবেদী কথা বলেন শুদ্ধ বাংলায়। তার কাছে এপার বাংলা ওপার বাংলা দুইই সহজ। বাংলাদেশের সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ধরতে তার এই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা এক বিশাল অস্ত্র। ‘দাদাগিরি’ নয়, বরং ‘ভ্রাতৃত্বের’ বার্তা দিতেই তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।


 আমলাতন্ত্রের ফাইল বনাম পিএমও-র সরাসরি হটলাইন
পেশাদার কূটনীতিকদের প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য দিল্লির অনুমতির অপেক্ষায় ফাইল চালাচালি করতে হয়। কিন্তু দিনেশ ত্রিবেদী এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে । এই ‘পলিটিক্যাল ডিপ্লোমেসি’ আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতাকে পাশ কাটানোর এক অব্যর্থ কৌশল।

আওয়ামী লীগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ভারসাম্য
তবে পথটা কিন্তু খুব একটা মসৃণ নয়। সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ। গঙ্গার পানি চুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ইস্যু নিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখাও একটি বড় চ্রালেঞ্জ। দিল্লি চায় না বাংলাদেশে উগ্রপন্থার উত্থান হোক। ভারত চাইছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, যেখানে সব পক্ষ সমান সুযোগ পাবে। এই জটিল রাজনৈতিক বার্তাটি ঢাকার দরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একজন আমলার চেয়ে একজন ঝানু রাজনীতিক অনেক বেশি কার্যকর।

সীমান্ত ও নিরাপত্তা: ব্যারাকপুর থেকে ঢাকা
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা সরাসরি নির্ভর করে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার ওপর। দীনেশ ত্রিবেদী পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরের সাংসদ ছিলেন। সীমান্ত অঞ্চলের জটিলতা, অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো তিনি নখদর্পণে রাখেন। ফলে নিরাপত্তা ইস্যুতে তিনি কেবল তাত্ত্বিক কথা বলবেন না, বরং বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে কাজ করতে পারবেন।

২০২৬-এর মহাচ্যালেঞ্জ: জল ও জ্বালানি
আগামী ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এসিড টেস্ট। গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন এবং জ্বালানি পাইপলাইনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রয়োজন এক বিশাল রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। এই সময়ে দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন প্রাক্তন রেল ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পাঠানোর অর্থ হলো—ভারত এই সম্পর্ককে কেবল টেকনিক্যাল হিসেবে নয়, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
ঢাকার রাজপথে দীনেশ ত্রিবেদীর পদচারণা কি তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মেঘ কাটানোর প্রথম বৃষ্টি হবে? সময় এবং তার ‘পার্সোনাল কেমিস্ট্রি’ই দেবে সেই জবাব ?

You might also like