আইনী সংকট ও নেতৃত্বের অভাবে  দিকহীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

4

 

 

- Advertisement -

- Advertisement -

ব্যাংক রেজ্যুলেশন  অধ্যাদেশ -২০২৫ অনুযায়ী গত বছর ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার দুর্দশাগ্রস্ত ৫ ব্যাংক – এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। মূল উদ্দেশ্য ছিলো দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন করা এবং যারা এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী, তাদের চিরতরে মালিকানা থেকে সরিয়ে দেয়া।

কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই সেই লক্ষ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে গত ১০ এপ্রিল সংশোধিত আকারে বিলটি পাস করে। ফলে অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হলেও, সেটিই এখন একীভূত ব্যাংকগুলোর জন্য হয়ে উঠেছে ‘গলার কাঁটা’।

সংকট আরও গভীর হয়েছে নেতৃত্বের অভাবে। গত ৪ মাসে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া হলেও কেউই দায়িত্ব পালনে আগ্রহ দেখাননি। ফলে বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসক দিয়েই চলছে কার্যক্রম। আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে একীভূত ব্যাংকগুলোর অবস্থা এখন দিকহীন জাহাজের মতো। আর এই দিকহীনতাই সংকটকে আরো গভীর করছে। এ অবস্থায় একীভূত কার্যক্রম চলবে কি না তা নিয়ে সরকারের অবস্থানের পরিস্কার ব্যাখ্যা চান ব্যাংকগুলোর প্রশাসকরা।

 

 

নতুন আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো –এখন থেকে আগের শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানায় ফিরতে আইনি বাধা  না থাকা। সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পেতে পারবেন সাবেক পরিচালক বা মালিকরা। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

এই ৫টি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিলো নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপের অধীনে। আর বাকি চারটি পরিচালনা করতো এস আলম গ্রুপ। যাদের প্রত্যক্ষ মদদে ব্যাংকগুলো কার্যত পথে বসেছে।  নতুন আইনে  তাদের এই ফেরার সুযোগ যেন ব্যাংকগুলোর কফিনে শেষ পেরেক মারার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে।

এ অবস্থায়  সাবেক মালিকরা যদি সত্যিই ফিরে আসে তাহলে, ব্যাংকগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে এবং আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ।

টিআইবি ও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এটি চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের পথ তৈরি করবে।

সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা। একীভূত করে সরকারি মালিকানায় নেয়ায়, শুরুতে তাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা না দেয়ার সিদ্ধান্ত জানালে আবার অস্থিরতা তৈরি হয়। পরে অবশ্য ৪ শতাংশ হারে মুনাফার কথা বলায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। কিন্তু আগের মালিকদের ফিরে আসার সুযোগে নতুন করে আবার চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এখন আবার আমানত তুলে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছেন। অনেক আমানতকারী শুরুতে দেয়া ‘হেয়ারকাট’ মেনে কেবল মূল টাকা ফেরত চাচ্ছেন।

ফলে ব্যাংকগুলো নতুন করে আর আমানত পাচ্ছে না। আর পুরনো ঋণের টাকা ফেরত আসাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

তারওপর গত নভেম্বরে শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করায় শেয়ারহোল্ডাররাও কার্যত নিঃস্ব। সবমিলিয়ে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর অবস্থা এখন তথৈবচ।

 

সরকারি হিসেবে, দুর্বল পাঁচ ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ধার হিসেবে ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকা দিয়েছে। এসব ব্যাংক মিলে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে সরকার মূলধন হিসেবে দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। প্রত্যেক আমানতকারীকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার জন্য আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। তবুও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা বা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। পুরো ব্যাংক খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের ঘাটতি এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, অনিশ্চয়তা এড়াতে ব্যাংকগুলোর সামনে তিনটি পথ রয়েছে। সেগুলো হলো- পুনঃমূলধনীকরণ, পুনঃবেসরকারিকরণ এবং পুনর্গঠন।

কিন্তু সেখানেও আছে সমস্যা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একটি  নির্দিষ্ট সময় পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে পুনঃমূলধনীকরণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটি করতে গেলে বিপুল সময় ও অর্থের প্রয়োজন হবে, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই এখনই পুনঃবেসরকারিকরণ করা হবে নাকি পুনঃমূলধনীকরণের পথে যাওয়া হবে—সে বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নেয়া হবে।

 

 

 

You might also like