মির্জা মোনালিসা
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো, তিনি চলে গেলেন রূপ নিয়ে বহুদূরে। পড়ে রইল এক জীবনের আড়াল, রহস্য আর অজস্র মিথ। সেই রূপবতী রাজকন্যা মিস ক্যালকাটা থেকে সূর্যকন্যাখ্যাত জয়শ্রী কবীর। তার সিনেমা কেউ বুঝুক আর না বুঝুক তাকে ঘিরে একধরণের মুগ্ধতা ছিলো মানুষের মাঝে।

যখন চলচ্চিত্র সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, সেই শৈশব থেকে জয়শ্রীর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমাদের মায়েরা তখন সিনেমা হলে আমাদেল নিয়ে যেতেন। যদিও আমার শৈশবের শহর টাঙ্গাইলে জয়শ্রী কবির অভিনীত ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলেছিল তিনদিন। কেবল মনিং শো। অন্য শো’তে অন্য সিনেমা। সারা টাঙ্গাইল জুড়ে তখন মাইকিং করা হয়েছিল- সীমানা পেরিয়ে , শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবীদের জন্য। এই ছবির দর্শক ছিল সেই সময়কার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা। আর তাদের শিক্ষকরা। তো তাদের সঙ্গে আমারও সৌভাগ্য হয় চলচ্চিত্রটি দেখবার।

আংশিক রঙিন সীমানা পেরিয়ের যে দৃশ্যে জয়শ্রী সৈকতে পড়ে থাকেন একা, সেই দৃশ্য আমার শিশুমনে কী ভীষণ দাগ কেটেছে তা বলবার নয়। আমি হলের মাঝেই কেঁদে ফেললাম: আম্মা, জয়শ্রীর মা কোথায়! এই অলৌকিক নারীর সঙ্গে ২০১৩ সালে আমার কথা বললবার সুযোগ হয়েছিল। তখন তিনি ইংল্যান্ডে।
সত্তরের দশকে ‘সীমানা পেরিয়ে’ কেবল একটি সিনেমা ছিলো না। এটি আসলে বাংলা চলচিত্রের আধুনিক ও মননশীলতার মাইলফলক। আলমগীর কবিরের দুটি চলচ্চিত্র সূর্যকন্যা ও সীমানা পেরিয়ে জয়শ্রী কবিরকে চেনায় অন্ররকম নায়িকারূপে। না নায়িকা বললে ভুল হবে। মানুষ হিসেবে। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী ও রূপালী সৈকতেও তাকে বাংলাদেশের চলচিত্রে বিশেষ স্থান দিয়েছিল।
বাংরাদেশের চলচিত্রের ইতিহাসে প্রথাবিরোধী ও মননশীল পরিচালক আলমগীর কবিরের চলচ্চিত্র কেবল সেলুলয়েডের গল্প নয়। শ্রেণিবিভাজন ্ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদেও দলিল। সত্যি বলতে কি আলমগীর কবির সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ। ‘সূর্যকন্যা’ এবং ‘সীমানা পেরিয়ে’ দুটোই বলতে গেলে ইউটোপিয়া। একটি নতুন সমাজের আকাঙ্খা। জয়শ্রী ছিলেন এই দুই সিনেমারই প্রাণ।

জয়শ্রীকে ঘিরে যেমন মুগ্ধতা ছিল, তেমনি ছিল অনেক রহস্য আর মিথ। বিশেষ করে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং হুট করে আড়ালে চলে যাওয়া নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ ছিলো না।
তবে খুব অল্প মানুষই তার সম্পর্কে জানেন। যারা তাকে কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন, ইংল্যান্ডে তিনি প্রায় নিভৃতচারীর মতো কাটাতেন। হুল্লোর তার পছন্দ ছিলো না। মাঝে মাঝে আরো নির্জনতার জন্য তিনি চলে যেতেন নিজস্ব একটা দ্বীপে। কথা বলতেন ধীরে। এতো ধীর আর স্থিত সে কণ্ঠস্বর যেন একটি প্রজাপতির সে শব্দে উড়ে না যায় ! নিজের দ্বীপে ছুটি কাটাতে যাওয়ার বিষয়টি হয়তো কেবল আভিজাত্য নয়, বরং কোলাহল থেকে সরে গিয়ে নিজের ভেতর ডুব দেওয়ার বাসনা। যেন তাঁর ‘সীমানা পেরিয়ে’ সিনেমার সেই জনমানবহীন দ্বীপের বাস্তবরূপ। আলমগীর কবিরের সিনেমাগুলোতেও আমরা তাঁর যে শান্ত ও স্নিগ্ধ উপস্থিতি দেখেছি, বাস্তব জীবনেও যেন সেই আখ্রান রচনা করেছেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়ল ১২ জানুয়ারি। ১৯৭৬ সালে ‘অসাধারণ’ সিনেমায় তিনি কিন্তু কিংবদন্তি উত্তম কুমারের বিপরীতেও অভিনয় করেছিলেন!
তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রা যেন এক রহস্যময় চলচ্চিত্রের মতোই সমাপ্ত হলো। কিছু মানুষ কেবল যান্ত্রিকতার পেছনে ছোটে না, কিছু মানুষ নিজের ভেতর এক ঈশ্বরীয় প্রশান্তি নিয়েও বেঁচে থাকতে জানেন। জয়শ্রী তাদের দলের। জয়শ্রীর ঠোঁট মেলানো সেই বিমূর্ত রাত্রিগুলো সারাজীবনই বোধহয় মৌনতার সুতোয় বোনা হবে
