বইমেলায় অংশগ্রহণ প্রকাশনা শিল্পের জন্য সম্পূর্ণ আত্মঘাতী
আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মেলায় অংশ নিচ্ছে না অনেক প্রকাশক । তেমনই একটি ব্যাখ্যা নিজের ফেসবুক পোস্টে দিয়েছেন ইউপিএল-এর স্বত্তাধিকারি মাখরুখ মহিউদ্দিন । নিচে পড়ুন
বইমেলার আড়ম্বর বিহীন একটা ব্যতিক্রমী ফেব্রুয়ারি মাস শুরু হয়েছে। কয়েকদিন পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নানান ঐতিহাসিক কারণেই এই নির্বাচন আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বইমেলার আলোচনা এই বিশাল ঘটনার তুলনায় বোধগম্য কারণেই প্রায় গৌণ। কিন্তু প্রকাশকদের জন্য এটাই তাঁর অস্তিত্বের মূল, এটাই তাঁর রুটি-রুজি, তাঁর নাগরিক আকাঙ্ক্ষাও এই প্রকাশনাকে ঘিরেই। তাই ইউপিএল কেন ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির বইমেলায় অংশ নিতে পারছে না সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই –

১। প্রথম যখন ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের কথা বলে হলো, আমাদের প্রতিক্রিয়া ছিল – এবারও বইমেলাকে বলি দেয়া হবে। গত বছরের বইমেলায় প্রকাশকরা অভূতপূর্ব হতাশা ও ক্ষতির শিকার হয়েছেন। করোনাকালেও একটা ক্ষতির মেলা আমরা করেছি ২০২১ সালে, কিন্তু তখন এক ধরণের মানসিক প্রস্তুতি ছিল। ২০২৫-এর মেলা আমাদের শুধু হতাশই করেনি, পুরো বছর জুড়েই বই বিক্রিতে অস্বাভাবিক মন্দা অবস্থা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশনা খাতের দিকে আদৌ তাকায়নি। একাধিক উপদেষ্টার কাছে আমরা নানান প্রস্তাব ও পরামর্শ নিয়ে গিয়েছি, তাঁরা মনোযোগ দিয়ে সম্মানের সঙ্গে শুনেছেন, কিন্তু কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেন নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সৃজনশীল প্রকাশকদের দাবি-দাওয়া, চাহিদা সৎ-সাহসের সাথে সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে পারে, এমন প্রতিনিধিত্বমূলক সমিতিও এখানে নেই; বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস) কোন বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন একটা অসহায় সময় প্রকাশনা শিল্প পার করছে।
২। এই অবস্থায় প্রথম ঘোষণা দেয়া হল যে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মেলা হবে। তারপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বলা হলো নির্বাচনের আগে কোন মেলা হবে না। নিন্দুকেরা বলতে শুরু করলেন, তার মানে এই সরকার চায় না যে মেলা হোক। সেই শুনে সরকারের কারও কারও হয়তো মনে হলো – এই বদনাম তো গায়ে নেয়া যাবে না! মেলা ফেব্রুয়ারি মাসেই হবে!
৩। রমজান মাসে এর আগেও মেলা হয়েছে। প্রকাশক-লেখক-পাঠকরা তার সাথে মানিয়ে নিয়ে মেলার আয়োজন করেছেন। বইয়ের মেলা প্রধানত জমে ওঠে সন্ধ্যার সময়ে, ইফতারি ও তারাবির নামাজকে মাথায় রেখেই একটা প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব। কিন্তু এবারে রোজা ছাড়াও অনেকগুলো প্রশ্ন প্রকাশকদের ব্যাতিব্যস্ত করছে। নির্বাচনের সময়ে কাগজের দাম বেড়েছে। বহু প্রকাশক বই ছাপার মত প্রেস ফাঁকা পাচ্ছেন না। নির্বাচনের ডামাডোল, নতুন সরকার গঠন—ইত্যাদি অনিশ্চয়তাপূর্ণ সময়ে তারা মেলার প্রস্তুতি কখন কিভাবে করবেন, কেউ বলতে পারেন না। ঈদের আগে অল্পদিনের মেলায় স্টল কবে বানানো হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে ক্রেতার উপস্থিতি কোথা থেকে হবে—এই সব বিষয়েই কোন অনুসন্ধান নেই। মেলা করতেই হবে!
অথচ, মেলার প্রস্তুতি মানেই প্রকাশকের বিনিয়োগ। করোনা থেকেই বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প কখনোই ঠিকঠাকমত উঠে দাঁড়ায়নি, গত একবছরের অর্থনৈতিক মন্দায় তা আরও খারাপ হয়েছে। বহু সাধারণ প্রকাশক ঋণগ্রস্ত হয়েছেন।
৪। প্রকাশকরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে ঈদের পর মেলা করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে একই মর্মে। বছরের এই একটা মেলার দিকে আমাদের প্রকাশকরা চেয়ে থাকেন। এটা একটা জাতীয় আয়োজন। সেই মেলা নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের আগেই কেন হুড়মুড় করে করতে হবে, এর সত্যি কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। অপেক্ষাকৃত সচ্ছ্বল ও বড় প্রকাশকরা হয়তো নিশ্চিতভাবে-ব্যর্থ-হতে-চলা এই মেলায় অংশ নিলেও ক্ষয়ক্ষতি একভাবে সামলে নিতে পারতেন। কিন্তু যেসব প্রকাশক গত এক-দেড় বছর ধরে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন বা লোকসানে চলছেন, তাঁদের উপায় কি হবে?
কোন ব্যক্তিগত পরিস্থিতি না, বহু প্রকাশকের অনুরোধও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। বড় প্রকাশকরা এমন মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, ছোট ও মাঝারি প্রকাশকরা একদম পথে বসবেন।
৫। সম্মিলিতভাবে তিনশতাধিক সৃজনশীল প্রকাশক এই মেলা পেছানোর জন্য দাবি জানিয়েছেন, এবং এর মধ্যে রয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অন্তত ৩০টি প্রকাশনা সংস্থাও। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ঈদের পর উপযুক্ত কোন সময়ে কিভাবে কোথায় মেলাটা হতে পারে, সব পক্ষের সদিচ্ছা থাকলে সেটা অবশ্যই পরিকল্পনা করে ঠিক করা সম্ভব। এই প্রকাশকরা সেই মেলা আয়োজনে সবরকম সহযোগিতাও করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
৬। এই পরিস্থিতিতে এই মেলায় অংশগ্রহণ করাকে আমরা সামগ্রিকভাবে প্রকাশনা শিল্পের জন্য সম্পূর্ণ আত্মঘাতী মনে করছি। তাই মেলা হলেও আমরা এতে অংশগ্রহণ করতে অপারগ— শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে না, এই একটা মেলা করোনা পরবর্তিতে ধুঁকতে থাকা বহু পুরনো প্রকাশককে কিংবা অনেক সম্ভাবনাময় নতুন প্রকাশককে ঝুঁকির মুখে ফেলবে— এই ভাবনা থেকেও। আমরা জানি যে আমাদের লেখকরা আমাদের সঙ্গে থাকবেন, এবং আমাদের এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তকে সম্মান করবেন।
৭। প্রকাশক হিসেবে আমি বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের শাসকসুলভ মনোবৃত্তির কথাও বলতে চাই। বাংলাদেশে যারাই ক্ষমতায় যান, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যে অন্তত সকলের সাথে কথা বলা, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য যৌক্তিক সমাধানের পথ সন্ধান করা— সেটি তারা ভুলে যান। পেশাজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা জনগণের যে কোন প্রতিনিধিত্বশীল অংশের সাথে যৌক্তিক আলাপে তাদের অপরাগতা, নিজেদের চিন্তাকেই চাপিয়ে দেয়া, জনগণকে নাগরিক নয়, প্রজাজ্ঞান করা তাদের বৈশিষ্ট্য। এবারের বইমেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই আমরা দেখছি।
প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে আমরা এই অবস্থাকে আমাদের জন্য অমর্যাদাকর বলে মনে করি। ইউপিএল শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেই অন্যতম বৃহৎ স্থানীয় প্রকাশনা সংস্থার সম্মান পায়। অজস্র খ্যাতনামা লেখকের জগতবিখ্যাত গ্রন্থ আমরা প্রকাশ করেছি। বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের অর্থনীতি-সমাজ-রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের বইগুলো অবিকল্প, এই প্রশংসা আমরা বহু বিদগ্ধ মানুষের কাছ থেকে শুনি।
শুধু আমরা আমাদের নিজ দেশেই এমন মর্যাদাহীন অবস্থায় থাকি, আমাদের কথাকে এখানে ক্ষমতাবানেরা গুরুত্ব দিতে আগ্রহী নন।
৮। বাংলাদেশে জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল প্রকাশনার কাজ কোনভাবেই লাভজনক ব্যবসা না। যেসব দেশে প্রকাশনা শিল্প বিকশিত হয়েছে, সবখানেই সরকারের উদাত্ত সহায়তা থাকে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য – কারণ জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল বই একটা দেশের নাগরিকদের মনন তৈরির হাতিয়ার। এই উপলব্ধি এত বড় গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আছে কিনা, বা থাকলেও কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতা কতটা আছে, তা নিয়ে সংশয় জাগে।
৯। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে কতটা চাপের মধ্যে এই মেলার আয়োজনে এগিয়ে যেতে হচ্ছে, সেটাও আমাদের বোধগম্য। কিন্তু একুশের বইমেলা যে বাধ্যবাধকতা বা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার চেয়ে আরও অনেক বড় কিছু, সেটা সরকার অনুধাবন করলে সবার মঙ্গল হতো।
আমাদের অংশগ্রহণের অপারগতা রইল দুঃখভারাক্রান্ত বাস্তবতার স্মারক হিসেবে। শুধু এইটুকু আশা করতে পারি যে নির্বাচনের পর যে সরকার দায়িত্ব নেবে, আমাদের যৌক্তিক দাবি শোনার মানসিকতা তাদের থাকবে।
