বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক লড়াইয়ের ছায়া পড়লো ক্রিকেটেও !

5
শেষ পযর্ন্ত ক্রিকেটেও পড়লো বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক আলোচনা চলছে । সাংবাদিক নওশাদ জামিল এ সম্পর্ক  নিয়ে লিখেছেন ফেসবুকে। নিচে তা হবহু তুলে ধরা হলো ।
” ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ ভারতে যাবে না। আজ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।’
- Advertisement -

- Advertisement -

এখন অনেকে প্রশ্ন করবেন, এটি কি আদৌ কোনো বাস্তব সিদ্ধান্ত, নাকি শীতকালে রাজনীতির মাঠ গরম করার জন্য ‘ভারতবিরোধী’ বক্তব্য? আদৌ কি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা আছে?
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, বাস্তবতা ও আইসিসির নিয়মকানুনের দিকে তাকাতে হবে। তাহলেই বোঝা যাবে ঘোষণাটি কি আসিফ নজরুলের আগের বিতর্কিত বক্তব্যগুলোর মতোই আরেকটি মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত বয়ান, নাকি সত্যিই বাস্তবসম্মত কোনো অবস্থান।
২০২৬ আইসিসি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। সূচি অনুযায়ী আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা। বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচই কলকাতায়, প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের বাকি তিনটি ম্যাচও নির্ধারিত হয়েছে কলকাতা ও মুম্বাইয়ে।
বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র এক মাসের মতো বাকি। আজ সকালে একদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিশ্বকাপের জন্য চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছে, আর ঠিক একই দিন বিকেলেই ক্রীড়া উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যাবে না এবং ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের জন্য আইসিসির কাছে আবেদন করা হবে।
আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী বলা যায়, বড় কোনো নিরাপত্তাজনিত বিপর্যয়, যুদ্ধ পরিস্থিতি বা গুরুতর রাজনৈতিক অস্থিরতা না হলে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে ভেন্যু ও সূচি এত কাছাকাছি সময়ে বদলানোর নজির নেই। এজন্য অত্যন্ত শক্ত, বাস্তব ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কারণ দেখাতে হয়। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া কোনোভাবেই সে ধরনের কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে না।
ধরা যাক, আইসিসির কাছে বাংলাদেশ আবেদন করল, তাতেও বিষয়টি সহজ নয়। ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আইসিসির অনুমোদনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষ দলগুলোর সম্মতিও প্রয়োজন। এখানেই বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল।
বাংলাদেশ রয়েছে ‘সি’ গ্রুপে, প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, ইতালি ও নেপাল। ইতালি ও নেপাল আইসিসির সহযোগী সদস্য; ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার বাস্তব সক্ষমতা বা সাহস—কোনোটাই তাদের নেই। ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রভাবশালী দল হলেও ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলে আইসিসিতে বাংলাদেশ কার্যত একাই পড়ে যাবে।
বাস্তবতা হলো আইসিসির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ ভারত। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, বাজার—সবকিছুতেই আইসিসি ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতের বিপক্ষে গিয়ে বাংলাদেশকে সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
আইসিসি ও ভারত সহজ যুক্তিই দেবে, গ্রুপ পর্বে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ম্যাচ নেই, অতিরিক্ত দর্শক বা উত্তেজনার সম্ভাবনাও কম। বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিলেই সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এ যুক্তির বিপক্ষে বাংলাদেশের দাঁড়ানোর জায়গা খুবই সীমিত।
তাহলে বাংলাদেশের হাতে আসলে কী বিকল্প থাকে? একমাত্র পথ বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার। কিন্তু সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চাপ, আর্থিক ক্ষতি এবং কূটনৈতিক জটিলতায় পড়বে। বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড চাপ সহ্য করতে পারবে না।
ফলে শেষ পর্যন্ত যা হওয়ার, সেটাই হবে, বাংলাদেশ দল ঠিকই ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলবে। এটার বাইরে অন্য কিছু হওয়ার তেমন সম্ভাবনা কি আছে?
আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্রিকেট ভারতের কাছে নিছক একটি খেলা নয়। এটি তাদের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে ক্রিকেটকে ঘিরে ভারত বরাবরই কৌশলগত রাজনীতি করে এসেছে। এ বাস্তবতায় পাকিস্তান কখনোই ভারতের ক্রিকেট–রাজনীতির কার্যকর জবাব দিতে পারেনি বরং একের পর এক বিশ্বকাপে ভারতে গিয়ে খেলেছে পাকিস্তান, যেখানে ভারত নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তানে খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটাররা ভারতে গিয়ে ধারাভাষ্য বা বিভিন্ন ক্রিকেট–সম্পর্কিত কাজে যুক্ত হতে পারলেই সেটিকে অনেক সময় বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়।
এ বাস্তবতার পাশে দাঁড়ালে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল মনে হয়। বাংলাদেশ বরাবরই ভারতের আনুকূল্য পাওয়ার ব্যাপারে অতিরিক্ত আগ্রহী থেকেছে, সেটা রাজনৈতিক হোক বা ক্রীড়াঙ্গনে। এ প্রেক্ষাপটে ক্রিকেটে শক্ত অবস্থান নেওয়ার কথা বলা যতটা সহজ, বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন, এটাই দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট রাজনীতির নির্মম সত্য।
সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, আসিফ নজরুল ও বিসিবির অবস্থান একটি পরিকল্পিত নাটক ছাড়া কিছু নয়। এ নাটক কিছু মানুষের আবেগে তালি পাবে, সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসা কুড়াবে। তবে বাস্তবতার মাটিতে এর কোনো ভিত্তি নেই “
You might also like