বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি

বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধমনি হরমুজ প্রণালি নিয়ে দিপ্তী রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদন

16

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ঘুরে ফিরে একটি নামই বার বার সামনে আসছে, তা হলো হরমুজ প্রণালি।  এর বড় কারণ, এই জলপথকে বলা হয় বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধমনি।  হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।  ১০৪ মাইল দৈর্ঘ্যের এই প্রণালি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ।

- Advertisement -

- Advertisement -

 

প্রণালিটির উত্তরাংশে ইরান এবং দক্ষিণাংশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত।  এর সরু অংশ যার প্রস্ত মাত্র ২১ মাইল চওড়া, সেটির নিয়ন্ত্রণ মূলত ইরানের হাতে, যা তাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করে।তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো প্রণালীটির মধ্য দিয়ে আসা-যাওয়ার জন্য ২ মাইল প্রশস্ত পথ ব্যবহার করে।  যা দুই মাইলের একটি বাফার জোন দ্বারা বিভক্ত।  দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা করা হতো, প্রণালীটির পুরো প্রস্থ অবরোধ করার ক্ষমতা ইরানের নেই।  তবে চলমান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ৯০ শতাংশেরও বেশি বাণিজ্যিক যান চলাচলকে অন্য পথে ঘুরিয়ে দেয়ায় প্রণালিটির ওপর ইরানের অপ্রতিসম প্রভাব রয়েছে।

হরমুজ প্রণালীর নামকরণ হয়েছে ইরানের ছোট দ্বীপ হরমুজের নামানুসারে।  বহু শতাব্দী ধরে এই দ্বীপটি একটি আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাণিজ্যিক লেনদেন হত এবং এটি সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের মাধ্যমে সংযুক্ত দূরবর্তী অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করত।

 

বিশ্ব অর্থনৈতিক ইতিহাসে, পারস্য উপসাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগর ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য সংযোগে হরমুজ একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল।  যদিও এই পথের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে বসরা, বেইরুত এবং আলেকজান্দ্রিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবে পারস্য উপসাগরের মুখে এর কৌশলগত অবস্থানের কারণে হরমুজের একটি স্বতন্ত্র স্থান ছিল।ভৌগোলিকভাবে বলতে গেলে, প্রণালিটি পারস্য উপসাগরকে সরাসরি ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং সে পথ ধরে জাহাজগুলো আরব সাগরে তথা ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে।  এই জলপথে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ এশিয়ার গ্রাহকদের বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।

 

তাই ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনী যখন ইরানে হামলা শুরু করে তখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ পথটি প্রতিশোধমূলক কৌশলের একটি প্রধান অংশ হিসেবে গ্রহণ করে ইরান।  গত দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে হরমুজ দিয়ে ইরনি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বন্ধ রাখায়  বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, এবং সেই সাথে প্রাকৃতিক গ্যাস , সার , অ্যালুমিনিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতু এবং অন্যান্য পণ্যের দামও বৃদ্ধি পায়।  এবং যার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা।

কেবল অর্থনৈতিক নয় সামরিক দিক দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালি।  এ অঞ্চলে ইরানি বন্দর বান্দার আব্বাস অবস্থিত, সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই প্রণালির কাছে অবস্থিত, যা মুসান্দাম উপদ্বীপের উভয় পাশে প্রণালীটির সবচেয়ে সংকীর্ণতম বিন্দু থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মাইল দূরে।  প্রণালিটি থেকে কিছুটা দূরে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর ১৯৯৫ সাল থেকে বাহরাইনে ঘাঁটি গেড়েছে।  যেখান থেকে প্রণালিটিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ভূমিকা পালন করে।মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে দুই পক্ষেরই হাতিয়ার এই হরমুজ প্রণালি।  বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও হরমুজ প্রণালিতে বহাল রয়েছে মার্কিন অবরোধ।  ফলে উভয়ের পক্ষের নিষেধাজ্ঞার কারণে জলপথটিতে কার্যত ‘দ্বৈত অবরোধে’ রয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে বিশ্ব এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি বলে মন্তব্য করেছেন ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির প্রধান ফাতিহ বিরোল।  যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।  বর্তমানে বিশ্ববাজার থেকে প্রতিদিন ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে গেছে।এ পথ বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং জ্বালানি রেশনিংয়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।   তাদের মত, গুরুত্বপূর্ণ এ পথ বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি হঠাৎ অনেক বছর পিছিয়ে যেতে পারে।  তাই অবরুদ্ধ হরমুজ খুলতে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। যুক্তরাজ্য হরমুজে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিতের পথ বের করতে প্রায় ৩৫টি দেশের সঙ্গে বৈঠকে বসছে। চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধবিরতি চেয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

 

এদিকে এই যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জলমাইন পাতে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি।  ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে যে, ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই ‘বিপজ্জনক অঞ্চল’ বিস্তৃত, যা প্যারিস শহরের আয়তনের চেয়েও ১৪ গুণ বড়।  তবে প্রণালির কোন কোন জায়গায় মাইন পাতা হয়েছিল, তার রেকর্ড ঠিকমতো রাখেনি রেভল্যুনারি গার্ড কোর।অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে কোনো নৌযানকে মাইন স্থাপন করতে দেখলে তাদের ওপর গুলি চালাতে মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা নিয়ে যেমন এখনো অনেক অস্পষ্টতা রয়েছে, ঠিক তেমনি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কবে স্বাভাবিক হবে তা এখনো অনিশ্চিত।   যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রকাশ্য লঙ্ঘনের’ কারণে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ।

 

এরইমধ্যে পেন্টাগন বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান যেসব মাইন পুঁতে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো অপসারণ করতে ছয় মাস পর্যন্তও সময় লাগতে পারে।  যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তারা মনে করছে।হরমুজ প্রণালী বিশ্ব তেল বাণিজ্যের প্রধান রুট হওয়ায়, ইতিহাসে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বারবার সংঘাত হয়েছে।  ১৬শ-১৭শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ, অটোমান ও ইংরেজদের মধ্যে যুদ্ধের পাশাপাশি, আধুনিককালে ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের অংশ হিসেবে “ট্যাঙ্কার যুদ্ধ” হরমুজ কেন্দ্রিক প্রধান সংঘাতের উদাহরণ।  আর এই সংঘাতগুলির পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী, যা রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুন রূপ দিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন বদলে দিয়েছিল।  ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর হরমুজ সংঘাত ঘোড়া, মশলা এবং সুতির বস্ত্রের বাণিজ্যের উপর প্রভাব ফেলে বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছিল।  সে হিসেবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে একই ভাবে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক প্রবাহকে ব্যাহত করে পদ্ধতিগত প্রভাব ফেলতে পারে।

 

সুতরাং, হরমুজ প্রণালীর উপর সমসাময়িক মনোযোগ একটি দীর্ঘতর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই অংশ, যেখানে কৌশলগত বাণিজ্য করিডোরগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ ভূ-রাজনৈতিক ফলাফলকে ক্রমাগত রূপ দান করে চলেছে।

You might also like