ওয়াশিংটন ডিসির অভিজাত হিলটন হোটেল। চারপাশে নিরাপত্তার অভেদ্য দেওয়াল, প্রতিটি কোণায় সিক্রেট সার্ভিসের তীক্ষ্ণ নজর। হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারের আলোঝলমলে সন্ধ্যায় যখন দেশি-বিদেশি ভিআইপিদের ভিড়, ঠিক তখনই ঘটে গেল সেই অকল্পনীয় ঘটনা।

এতো এতো নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে হিলটন হোটেলের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে ঢুকে পড়ল আততায়ী। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে যেখানে মাছি গলারও উপায় নেই, সেখানে সবার অলক্ষ্যে বলরুমের ঠিক বাইরে অবস্থান নিল সে। এরপরই সেই স্তব্ধ করা মুহূর্ত—হঠাৎ গর্জে উঠল শটগান। গুলি ছুড়ল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিরাপত্তারক্ষীর দিকে। মুহূর্তের মধ্যে বিলাসবহুল বলরুমের উৎসবের আবহ পাল্টে গিয়ে তৈরি হলো রণক্ষেত্র। আতঙ্কে অতিথিরা টেবিলের নিচে আশ্রয় নিলেন, আর সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা শরীর দিয়ে ঢেকে ফেললেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াকে।
কিন্তু কে এই আততায়ী? কীভাবে সে প্রবেশ করল এই দুর্ভেদ্য দুর্গে?
তদন্তে বেরিয়ে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। হামলাকারী কোনো সাধারণ দুষ্কৃতকারী নয়, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (Caltech) উচ্চশিক্ষিত এক প্রকৌশলী— কোল টমাস অ্যালেন। ৩১ বছর বয়সী এই শিক্ষক ও গেম ডেভেলপার হোটেলেরই একজন ‘গেস্ট’ হিসেবে সেখানে চেক-ইন করেছিলেন। হোটেলের অতিথি হওয়ার সুযোগটি নিয়েই তিনি সুকৌশলে এড়িয়ে যান কয়েক স্তরের মেটাল ডিটেক্টর আর তল্লাশি। তাঁর কাছে শুধু শটগান নয়, ছিল হ্যান্ডগান আর ধারালো ছুরিও।
এই দৃশ্য যেন ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর পুনরাবৃত্তি। ঠিক ৪৫ বছর আগে, ১৯৮১ সালে এই হিলটন হোটেলের সামনেই প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল জন হিঙ্কলি জুনিয়র। মাঝখানে সাড়ে চার দশকের ব্যবধান থাকলেও প্রেক্ষাপট আর আতঙ্ক যেন হুবহু এক।
ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দার ঝড় ওঠে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত এক্স (সাবেক টুইটার) বার্তায় বলেন, গণতন্ত্রে কোনো ধরনের সহিংসতার স্থান নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর পরিবার নিরাপদ আছেন জেনে আমি স্বস্তি বোধ করছি।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই মৃত্যুভয় নতুন কিছু নয়। গত ১০ বছরে একাধিকবার তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা হয়েছে—কখনও পেনসিলভানিয়ার নির্বাচনী মঞ্চে কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে বুলেট, কখনও ফ্লোরিডার গলফ কোর্সে উদ্যত হয়েছে রাইফেল। বারবার ফিরে আসা এই ‘ডেথ-হোল’ থেকেও ট্রাম্প যেন অদম্য। আটকের পর আততায়ীর সেই মাটিতে পড়ে থাকা ছবি যখন ভাইরাল, তখন ট্রাম্পের দৃপ্ত কণ্ঠ শোনা গেল সামাজিক মাধ্যমে।
হামলার পর ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ অ্যাকাউন্টে জানিয়েছেন যে তিনি ভয় পাওয়ার পাত্র নন। তিনি বলেন, আমরা কাউকে আমাদের সমাজ দখল করতে দেব না। এই ঘটনার পর মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন উঠেছে এবং ঘটনার পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা বৃহত্তর পরিকল্পনা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে এফবিআই।
