ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার রবি চন্দ্র দাসের ছেলে দীপু চন্দ্র দাস পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডে চাকরি করতেন লিংকিং সেকশনে। গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে কারখানায় কাজ করার সময় তাঁর সহকর্মীরা অভিযোগ করেন যে, দীপু মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছে। এই আলাপটি দ্রুত কারখানা থেকে বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর কারখানার বাইরে উত্তেজিত জনতার হাতে দীপুকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
উত্তেজিত জনতা (মব বলব না প্রেসার গ্রুপ?) দীপুকে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর দীপুর লাশ ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি গাছে ঝুলিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই যে এত ঘটনা ঘটছে এর মধ্যে পুলিশ আসেনি, সেনাবাহিনীও আসেনি। লাশের গায়ে আগুন দেওয়ার পর সেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনী যায়, তারপর তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে,। এরপর আগুন নিভিয়ে লাশ উদ্ধার করে ভালুকা মডেল থানায় নেওয়া হয়। আমার জানামতে এই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।
যেসব প্রশ্ন এখনই তোলা দরকার, তাহলো দীপু বাটন ফোন ব্যবহার করত; তার মানে সে যখন কাজ করছিল তার ফেসবুকে এরকম কোনো মন্তব্য পোস্ট করেনি দীপু যা ধর্ম অবমাননা হতে পারে, হযরত মুহাম্মদ (সা.)–কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ হতে পারে। কারণ এরকম কিছু এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি।
যতখানি জানা যাচ্ছে, ’তাতে দীপু তার কারখানার সহকর্মীদের কাছে নবীজির অবমাননা হয় এমন মন্তব্য করেছিল’ এমন অভিযোগ করেছে তার সহকর্মীরা। সেই সহকর্মী কারা? তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, বলতে হবে কি বলেছিল দীপু? কে কে শুনেছে? নিশ্চয় সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। যদি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সাউন্ড নাও থাকে তাহলে অনেককিছুই বোঝা যাবে। বডি লেঙ্গুয়েজ এমন কী ঠোট নাড়া দেখেও বলে দেয়া যাবে দীপু কি বলেছিল।
এরপর জানা দরকার কারখানার মধ্যে বলা (যদি আদৌ কিছু বলে থাকে ধর্ম বিষয়ে) কোনো কথা সেটা কারখানার বাইরে কে ছড়ালো? যে ছড়িয়েছে তার উদ্দেশ্যটা তখন বোঝা যাবে, যে ধর্ম না আসলে অন্যকিছু। সেই অন্যকিছুটা কি?!
যদি ধর্ম অবমাননা কেউ করেও তাহলে কাউকে খু/ন করে পুড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি আসলে আদৌ বিচার?!!
আমাকে বলেন এটা কেমন বিচার? এটা তো আফগানিস্তানেও হয় না। মানে যেখানে শরিয়া আছে সেখানে এভাবে অভিযুক্তকে পিটিয়ে মারার সরকারি নিয়ম তো আফগানিস্তানে নেই। পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইন আছে, সেখানেও কি এভাবে একটা লোক মুখে বলেছে সেই অভিযোগে শত শত মানুষ একজনকে পিটিয়ে মারবে, তারপর আগুন দেবে? এটা কেমন মুসলমান আমরা? নাকি ধর্মকে সামনে এনে অন্য কোনো অপরাধ আসলে হয়েছিল যেটাকে ঢাকতে দীপুকে খুন করার জন্যই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হলো? এই প্রশ্নগুলো করতে থাকেন এই কারণে যে, যে কোনো সময় আপনার বা আরেকজনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে রাস্তাঘাটে মানুষ পিটিয়ে মারা যাবে।
ধরেন, আপনার স্ত্রী বাচ্চা নিয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গেলেন বা ধরেন কমলাপুর রেল স্টেশনে গেলেন। আপনার স্ত্রীকে কেউ বাজে কথা বলেছে, আপনি তার প্রতিবাদ করলেন। তারপর কিছু যুবক বলা শুরু করল, আপনি ধর্ম অবমাননা হয় এমন কোনো শব্দ বলেছেন। বুঝতে পারছেন এরপর কী হবে? আপনি হিন্দু, না বৌদ্ধ, নাকি খ্রিস্টান নাকি মুসলমান; মুসলমান হলে শিয়া না সুন্নি কোন মাজহাবের তা শোনার আগেই কিন্তু আপনাকে পিটিয়ে পাড়িয়ে মারা হবে। আশেপাশে তেলের জোগান থাকলে পুড়িয়ে দিবে লাশ।
এই যে পৈশাচিক একটা আনন্দ উন্মাদ জনগণ পাবে তাকে কিন্তু আপনি আবার ’মব’ বলতে পারবেন না, কারণ ইন্টেরিম চিফের প্রেস সচিব বলেছেন, এসব ‘মব’ বলে মানুষের ক্ষোভের যে ন্যায্য আন্দোলন তাকে খাটো করা হচ্ছে। এটাকে প্রেসার গ্রুপ বলতে হবে। তত সময় আপনার বুকের বাম পাশে যে হৃদপিণ্ড সচল ছিল সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। আর আপনার পরিবার, যে আপনি একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি সেই আপনি দুনিয়া থেকে নাই হবার কারণে স্ত্রী, পুত্র কন্যা, বাবা মা, ভাই বোন সবাই আন্ধার দেখছে।
দীপু যে ধর্ম অবমাননা করেছে এই তথ্য প্রথম কে বাইরে নিয়ে গেছে? নিশ্চয় ফোন করেছিল বাইরের লোকদের বা ওই ফ্লোর থেকে হেঁটে গেট খুলে বাইরের মানুষকে কেউ না কেউ বলেছে। পুলিশের উচিত প্রথমেই এই লোকটাকে বের করা যে, দীপু ধর্ম অবমাননা করেছে তা প্রথম কার মুখ থেকে শোনা গেছে। তাকে ধরেন, জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আস্তে আস্তে সব বেরিয়ে আসবে।
আপনাদের মনে আছে জুয়েল নামের একজন ব্যক্তিকে উন্মাদ জনগণ পুড়িয়ে মেরেছিল লালমনিরহাটে? জুয়েল কিন্তু হিন্দু ছিল না, সে ছিল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি মানুষ। নামাজের পরে কোরআন শরিফও তেলাওয়াত করা তার নিয়মিত ধর্ম চর্চার মধ্যে পড়ত। তো, জুয়েলকে কিন্তু কোরআন অবমাননার কারণে পুড়িয়ে মেরেছিল লালমনিরহাটের কিছু উন্মাদরা। এখন আমরা এই উন্মাদের সমাজে বড় অংশের মাথা এখনো পরিষ্কার, তারা না জেনেশুনে, না বুঝে কোনো কিছুর অর্থ করে না; তাদের একটা পরিষ্কার অবস্থানে যেতে হবে। দেশটা কি তারা এইসব লোকের হাতে ছেড়ে দেবে? নাকি দেশটাতে তার ও তাদের সন্তান এবং সন্তানাদীরা যাতে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে সেরকম একটি সহনশীল, যুক্তিবাদী, ধীর, স্থির ন্যায়ানুগ সমাজ নির্মাণে তার ও তাদের ভূমিকা রাখবে।
এসব কাজ মূলত রাজনৈতিক দলের, যারা ক্ষমতায় যায়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোতে আরও কথিত পপুলার হওয়ার জন্য এমন হাওয়া দিতে শুরু করে তাতে উন্মাদের ব্রেনে আরও এনার্জি যায়। আমাদের দায়িত্ব হলো, প্রথমে নিজের পরিবার রক্ষা করা, তারপর আশেপাশের লোকদের পারলে রক্ষা এবং যে দলকে ভোট দেই তাদের ওপর চাপ রাখা এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের। সেই চাপটি আপনি আপনার আশেপাশে বলে, সোশ্যাল মিডিয়াতে দাবি জানিয়ে করতে পারেন ছোট ছোট ভিডিওর মাধ্যমে। পরিষ্কার করে নিজের অবস্থান বলুন হে নাগরিক, বলুন আমরা একটা মানুষের সমাজ চাই যেখানে বিনা বিচারে কোনো সহ-নাগরিককে খুন করা যাবে না। যদি এটা না পারেন এটা দঙ্গলের শাসন কায়েম হবে, আপনি থাকতে পারবেন না। আমি ও আমরা তো পারবই না।
You might also like
সম্পাদক :মোঃ শাহজালাল
২০২৫ © ব্যানারনিউজবিডি কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
🚧 এই সাইটটি বর্তমানে নির্মাণাধীন 🚧
২০২৫ © ব্যানারনিউজবিডি কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
🚧 এই সাইটটি বর্তমানে নির্মাণাধীন 🚧
You cannot print contents of this website.
