ইরানের রাজপথে অকুতোভয় নারীরা , যেন ছাইচাপা আগুন থেকে ফিনিক্স পাখিরা ডানা মেলছে

23

 

 

- Advertisement -

- Advertisement -

বিক্ষোভ, আগুন, স্লোগান, হাসপাতালে লাশের সারি আর আহতদের আহাজারি—এটাই এখন ইরানের চিত্র। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর বিক্ষুব্ধ ইরানের যে ছবি বিশ্ববাসী দেখেছিল, এবারের আন্দোলন তার চেয়েও বেশি চতুর্মুখী ডালপালা বিস্তার করেছে। রাজপথে নেমে এসেছেন অকুতোভয় নারীরা; যেন ছাইচাপা আগুন থেকে একেকটি ফিনিক্স পাখি ডানা মেলছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করেছে। গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে: ইরানি নারীরা দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবিতে আগুন ধরিয়ে সেই শিখা দিয়ে নির্বিকারভাবে সিগারেট ধরাচ্ছেন। এটি যেন এক প্রকাশ্য ঘোষণা—’তোমাকে আর মানি না’। চরম দমন-পীড়নেও তাদের রুখে দেওয়া যাচ্ছে না। ২০২২ সালে যেখানে হিজাব পোড়ানো ছিল প্রতীকী প্রতিবাদ, ২০২৬-এ খামেনির ছবি দিয়ে সিগারেট জ্বালানো হলো সরাসরি শাসকের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করা।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে নীতি পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যু ইরানকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। হিজাবের বাধ্যবাধকতা বাতিল আর নীতি পুলিশের বিলুপ্তিই ছিল তখন মূল দাবি। ইরানি সরকার সেই আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করে; শত শত প্রাণ ঝরে যায়, হাজার হাজার মানুষ কারাবন্দি হয়। বাহ্যিকভাবে আন্দোলন ঠেকানো গেলেও মানুষের মনের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। ২০২৫-এর শেষভাগে সেই ক্ষোভই নতুন করে দাবানল হয়ে ফিরে এসেছে।

ইরানের এই নারী নেতৃত্বের পথ যারা তৈরি করেছিলেন, তারাও আছেন বর্তমান আন্দোলনে। ২০০৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আইনজীবী শিরিন এবাদি বর্তমানে নির্বাসিত হলেও তিনি তরুণীদের প্রধান প্রেরণা। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের নোবেল বিজয়ী লড়াকু নেত্রী নার্গিস মোহাম্মদি বর্তমানে এভিন কারাগারে বন্দি। কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর থেকেও তিনি ভয়েস রেকর্ড এবং চিঠির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সাহস জোগাচ্ছেন। এই নেত্রীরা প্রমাণ করেছেন যে, ইরানি নারীরা কেবল ভিক্টিম বা শিকার নন, তারা একেকজন অকুতোভয় যোদ্ধা।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আন্দোলনের গভীরতা ২০২২-এর চেয়েও অনেক বেশি। ইরানি মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর নজিরবিহীন দরপতন এবং আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। এবার আর বিক্ষোভকারীরা কেবল হিজাব আইনের পরিবর্তন চান না; তারা চান “রেজিম চেঞ্জ” বা বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন। তেহরান থেকে শুরু করে ইরানের ৩১টি প্রদেশেই এই দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করলেও ইরানিরা টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ভিপিএন ব্যবহার করে বিশ্বকে তাদের লড়াইয়ের কথা জানাচ্ছেন।

এই আন্দোলনের মাধ্যমে আরেকটি বিষয় সামনে চলে এসেছে—পাহলভি শাসন বনাম ইসলামি প্রজাতন্ত্র। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ইরানকে আধুনিক ও পশ্চিমা ধাঁচে গড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু একনায়কতন্ত্র ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। অদ্ভুতভাবে, আজকের অনেক বিক্ষোভকারীর কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে শাহ-এর পুত্র রেজা পাহলভির নাম। তারা মনে করছেন, বর্তমান ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারেন প্রবাসে থাকা এই উত্তরাধিকারী।

বাস্তবিক অর্থে, ইরান আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। লড়াকু মানুষ এখন এমন এক ভোরের প্রতীক্ষায়, যেখানে ‘নারী, জীবন এবং স্বাধীনতা’ কেবল স্লোগান হয়ে থাকবে না, হবে যাপিত জীবনের সত্য।

You might also like