নেতাজী সুভাষ বোসের দেহভস্ম বিদেশ থেকে মাতৃভূমিতে  আনতে চান কন্যা অনিতা বোস

জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রক্ষিত আছে নেতাজীর চিতাভস্ম দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে , কিন্তু মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হয়নি

21

জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে এক কন্যার আর্তি, মৃত্যুর আগে অন্তত বাবার দেহভস্ম বিদেশের মাটি থেকে মাতৃভূমিতে  আনতে চান তিনি।পিতার প্রতি জন্মদিবসেই  এ দাবি তুলে আসছেন, মহানায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের কন্যা আবার অনিতা বোস । আজ  ২৩ জানুয়ারি নেতাজীর জন্মদিনে আবারো সেই দাবি তুললেন তিনি।

- Advertisement -

- Advertisement -

আজ যখন নেতাজীর ১৩০তম জন্মজয়ন্তী পালিত হচ্ছে সারাবিশ্বে, তখন সুদূর জার্মানি থেকে ভেসে আসা এক বৃদ্ধা কন্যার কণ্ঠস্বর  ইতিহাসকে পুনরায় এক  বিষণ্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

অনিতা বোস পাফ—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একমাত্র কন্যা। ৮৩ বছর বয়সের এই মানুষটির জীবনের শেষ চাওয়া আড়ম্বর না হোক, সাদামাটা আয়োজনে তিনি শুধু চান তাঁর বাবার চিতাভস্মের শেষ পরিচয়টুকু নিজের করে নিতে।  অনিতা বোস পাফের  আকুতি— “ আমি বেঁচে থাকতে থাকতেই এই রহস্যের ( নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্য) উদ্‌ঘাটন দেখে যেতে চাই।”

 

জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রক্ষিত নেতাজীর চিতাভস্ম দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে অপেক্ষা করে আছে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে আসার জন্য। কিন্তু পথ আগলে দাঁড়িয়েছে সুবিশাল রহস্যের পাহাড়!

 

নেতাজী,সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবন যেন এক মহাকাব্যিক  উপন্যাস,  শেষ পাতাটা কেউ ছিঁড়ে ফেলেছে। ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্টের সেই বিমান দুর্ঘটনাকে আজও ভারতবাসী পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। আর সেই অবিশ্বাসের আগুনেই ঘি ঢেলেছে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদের সেই রহস্যময় ‘গুমনামী বাবা’ বা ‘ভগবানজি’র উপাখ্যান। সাধারণ মানুষের বড় একটা অংশ আজও বিশ্বাস করে, নেতাজি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি; বরং ছদ্মবেশে ভারতমাতার কোলেই ফিরে এসেছিলেন। গুমনামী বাবার ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া নেতাজির পরিবারের ছবি, হাতের লেখা আর অদ্ভত সব তথ্যের মিল এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিজ্ঞান আর আবেগের এই দ্বন্দ্বে ইতিহাস আজও থমকে আছে যেন।

 

এদিকে, তাঁর কন্যা অনিতা, দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছেন রেনকোজি মন্দিরে রাখা চিতাভস্মের ডিএনএ পরীক্ষার। তিনি চান বিজ্ঞানের আলোয় ইতিহাসের এই অন্ধকার গলিটা অন্তত একবার স্পষ্ট হোক। তিনি জানেন, গুমনামী বাবা বা রাশিয়ার গুলগ নিয়ে যত রহস্যই থাকুক না কেন, রেনকোজির ওই ছাইয়ের একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিতে পারে।

 

যে মানুষটি সারা জীবন ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে ছদ্মবেশে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন স্বাধীনতার মশাল জ্বালাতে, আজ তাঁর নিজের পরিচয়টুকু নিশ্চিত করতে তাঁর কন্যাকে ভারত ও জাপান সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে! স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও কেন আমাদের এই মহানায়কের অবশিষ্টাংশ বিদেশের মাটিতে পড়ে থাকবে? অনিতা পাফের এই প্রশ্নটি কি সবার মনে ধ্বনিত হবে!

 

নেতাজী সুভাস বোস  এক করুণ ট্র্যাজেডির নায়ক। একদিকে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকা এক বীর, আর অন্যদিকে একাকী এক বৃদ্ধা কন্যা, যাঁর শৈশব বাবার সান্নিধ্য পায়নি, অথচ যাঁর বার্ধক্য কাটছে বাবার শেষ স্মৃতিটুকু দেশে ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে। এটি কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি এক  মানবিক আর্তি।

 

নেতাজির রহস্য হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি ভেদ হবে না। গুমনামী বাবার অবয়বে তিনি ফিরেছিলেন কি না, সেই বিতর্ক হয়তো চায়ের দোকানে বা ইতিহাসের পাতায় আজীবন বেঁচে থাকবে। কিন্তু রেনকোজির সেই ভস্ম যদি সত্যিই তাঁর হয়ে থাকে, তবে তাঁর অধিকার আছে সসম্মানে গঙ্গার জলে মিশে যাওয়ার।

সূত্র : স্টেটসম্যান

You might also like