ওল্ড বয়েজ ক্লাব সিনড্রোম নাকি প্রতিষ্ঠানের গোলকধাঁধায় লেখক ?
আফসানা বেগমের অকাল অব্যাহতির প্রতিক্রিয়া
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে আফসানা বেগম কে। এ নিয়ে আলোচনা শেষ হয়ে হয়েও যেন শেষ হচ্ছে না। তবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হওয়ার আগে তার একটি নিজস্ব পরিচিতি ছিলো তিনি লেখক আফসানা বেগম। বিদুষী, সুলেখক, সুন্দরী , হাস্যোজ্জ্বল আফসানা বেগম লেখক সমাজে বেশ সমাদৃত ছিলেন। হয়তো সেকারণেই তাকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়।

আফসানা বেগমের ফেসবুকের ভাষ্য অনুযায়ী , তিনি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টা চালান। এখানে বলে রাখা ভালো , এই ধরণের প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, শিশু একাডেমির মতো জায়গায় ক্রয়বিক্রয়, অনুদান এবং প্রকাশনা, মেলা সংক্রান্ত নানা কর্মকা- থাকে । সেখানে সরকরি টাকা পয়সার তসরুফ , তদবির সেই পুরনো আমল থকেই হয়ে আসছে। না হলে সরকারি মাল, দরিয়া মে ডাল এই প্রবাদটিই তৈরি হতো না। যাই হোক। আফসানা বেগম এখন আর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক নন, সেখানে নতুন নিয়োগ পেয়েছেন আরেক লেখক সমাজে পরিচিত মুখ সাখাওয়াত টিপু। সাখাওয়াত টিপুকে অভিনন্দন। যে কারণে আফসানা বেগমকে সরিয়ে তাকে বসানো হয়েছে তিনি তা করতে পারবেন। তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে তাদেও পূর্বসূরিদের চেয়ে ভিন্ন উচ্চতায় দাঁড় করাবেন।
তবে, আফসানা বেগমের আকস্মিক অপসারণ কি শুধুই অপসারণ, যেহেতু এটি চুক্তি ভিত্তিক ছিল, তাই অপসারণ হতে পারে। কিন্তু কোনো রকম ভব্যতার ধার ধারেনি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। ব্যক্তিগত পরিচিতির জন্য তাকে সম্মানজনকভাবে অব্যাহতি দেয়া যেতো। সাখাওয়াত টিপুর বেলায়ও যদি এমন ঘটে তাও লেখক সমাজ মানতে পারবে না।
প্রতিষ্ঠানের ধর্মই হলো কাঠামো টিকিয়ে রাখ। এটি নানা প্রটোকল আর আপসের শেকলে বন্দি। অন্যদিকে, লেখকের কাজ হলো সেই শেকল ভাঙা। আফসানা বেগম (তার ভাষ্য অনুয়ায়ী) যখন বই কেনায় স্বচ্ছতা আনা বা দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনিয়ম দূর করার মতো সংস্কারে হাত দিয়েছেন, তখনই তিনি কাঠামোর কাছে ‘অস্বস্তিকর’ হয়ে উঠেছেন। কারণ, আমলাতন্ত্র পরিবর্তনের চেয়ে স্থবিরতাকেই নিরাপদ মনে করে। লেখক যখন ফাইলবন্দি হয়ে পড়েন, তখন তিনি আর স্বাধীন স্রষ্টা থাকেন না; বরং কাঠামোর একজন রক্ষক হতে বাধ্য হন। আর তা না পারলেই তাকে ছুড়ে ফেলা হয়।
এই অপসারণকে কেউ চাইলে জেন্ডার পলিটিক্স ও ‘ওল্ড বয়েজ ক্লাব’ সিনড্রোম নাম দিতে পারবেন। লৈঙ্গিক রাজনীতির আলোকে দেখলে দেখা যায়, সমাজ আজও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কেবল ‘পুরুষালি’ গুণ হিসেবে গণ্য করে। একজন নারী যখন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে সংস্কার করতে চান, তাকে ‘সাহসী’ বলার বদলে ‘অবাধ্য’ বা ‘ঝামেলাপূর্ণ’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া সহজ হয়। ক্ষমতার অলিন্দে যে অদৃশ্য ‘ওল্ড বয়েজ ক্লাব’ বা পুরুষতান্ত্রিক নেটওয়ার্ক থাকে, একজন নারী লেখক সাধারণত তার অংশ হন না। ফলে কোনো সংকট তৈরি হলে তাকে রক্ষা করার চেয়ে সরিয়ে দেওয়াটাই সিস্টেমের জন্য সহজ সমাধান হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ক্ষমতা লেখককে কোনো স্থায়ী আসন দেয় না; বরং কলমের তেজ কেড়ে নেয়। আফসানা বেগমকে যেভাবে কোনো কারণ ছাড়াই অব্যাহতি দেওয়া হলো, তা সৃজনশীল মানুষের জন্য চরম অসম্মানজনক। এটি আবার মনে করিয়ে দিল . ক্ষমতা কাঠমোর কাছে যাওয়া লেখকের জন্য অসম্মানের। লেখার জগতে যিনি একাধিপতি তাকে আসলে নির্মোহই হতে হয়। লেখকের আসলে ক্ষমতাকাঠামোর কাছে থাক উচিত নয়। এতে তার সৃষ্টিশীলতা এবং সুনাম দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শাঁওলি সুমন
